বাংলাদেশের সংবাদমালিকদের সমিতি (NOAB) আজ ঢাকা শহরের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত যৌথ প্রতিবাদ সভায় জানিয়েছে যে, আগামী মধ্য জানুয়ারি জাতীয় পর্যায়ে একটি বৃহৎ সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হল সাম্প্রতিক সময়ে The Daily Star ও Prothom Alo-র ওপর সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের দায়ী ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মিডিয়া নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিগুলোকে একত্রে উপস্থাপন করা। সমিতির সভাপতি এ কে আজাদ এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, দায়ী অপরাধীরা ধরা না পড়া পর্যন্ত প্রতিবাদ আন্দোলন থামবে না।
সম্মেলনের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা সভার শিরোনাম ছিল “মব হিংসার আক্রমণে বাংলাদেশ” এবং এটি সম্পাদকীয় পরিষদ (Editors’ Council) ও NOAB-এর সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয়। হোটেলের বড় হলের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক, সাংবাদিক ও মিডিয়া সংস্থার প্রতিনিধিরা, যারা অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।
সভায় উপস্থিত সবাই একমত হয়েছেন যে, মিডিয়া সংস্থাগুলোকে একত্রে দাঁড়িয়ে এই ধরনের হিংসা মোকাবেলা করা জরুরি। আজাদ বলেন, সকল উপস্থিতি একসাথে এই হুমকির মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত এবং কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতা বা দুর্বলতা মিডিয়ার স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করতে পারে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, এই ধরনের আক্রমণকে থামাতে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডের পর The Daily Star-এর সম্পাদক মাহফুজ আনামের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুরোধের কথা আজাদ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আক্রমণের আগে মাহফুজ আনাম বহু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কাছে সুরক্ষার আবেদন করেছেন, তবে কোনো সাড়া পাননি। এই অনুরোধের পরেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই কিছুই না করে সুরক্ষা ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি, এমনটি আজাদ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি ঘটার পরই সুরক্ষা দল উপস্থিত হয়, কিন্তু তখন ক্ষতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়। এই দেরি করা প্রতিক্রিয়া মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে তা যথেষ্ট নয়।
অগ্নিকাণ্ডের সময় উপস্থিত থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আজাদ তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ঘটনাস্থলে সব ধরনের নিরাপত্তা গোষ্ঠী উপস্থিত ছিল, তবে কোনো একটিও সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ বা হস্তক্ষেপ করেনি। এই অনুপস্থিতি অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় এবং মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে।
অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২৮ থেকে ২৯ জন সাংবাদিক অস্থায়ীভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘরে আটকে ছিলেন, যা তাদের শ্বাসরুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আজাদ জানান, যদি অগ্নিকাণ্ড আরও ১৫ মিনিট চলত, তবে ধোঁয়া ও অক্সিজেনের অভাবে অনেকের প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা ছিল। এই পরিস্থিতি মিডিয়া কর্মীদের জন্য এক ধরনের জীবন-হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আজাদ এই ঘটনাকে “মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া এক ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, মিডিয়া কর্মীদের জীবনকে এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এভাবে কি আমাদের কণ্ঠস্বর নিভিয়ে দেওয়া হবে?” এবং মিডিয়া স্বাধীনতার ওপর আক্রমণকে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আজাদ জানান, জাতীয় সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে মিডিয়া কর্মীদের সম্মিলিত দাবি ও প্রস্তাবনা একত্রিত করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সম্মেলনের পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারণের জন্য উপস্থিত সকলের মতামত সংগ্রহ করা হবে এবং তা ভিত্তিক একটি কার্যকরী পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হল অগ্নিকাণ্ডের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং মিডিয়া কর্মীদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-নিয়ম প্রণয়ন করা। আজাদ বলেন, এই সম্মেলন থেকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো মিডিয়া সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ আক্রমণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া, আজাদ উল্লেখ করেন যে, প্রতিবাদ আন্দোলনটি দায়ী অপরাধীদের ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত থামবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
এই ঘোষণার পর, উপস্থিত সাংবাদিক ও সম্পাদকরা সম্মেলনের প্রস্তুতি ও কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। তারা একত্রে কাজ করে মিডিয়া সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
সারসংক্ষেপে, NOAB-এর এই উদ্যোগ মিডিয়া স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এবং জাতীয় পর্যায়ে একত্রিত হয়ে মিডিয়া কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করবে।



