বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন সোমবার জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎসুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সংক্রান্ত আলোচনাগুলি সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
ইপিএ আলোচনার সমাপ্তি বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে বাংলাদেশি পণ্যগুলো জাপানের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পাবে, যা রপ্তানি পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস, জুট, চা, মাছ ও ফলের মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জন্য এই সুযোগটি বড় সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।
বৈঠকের সময় প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান, ইপিএর প্রধান আলোচক আয়েশা আক্তার, উপপ্রধান আলোচক মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ এবং ফোকাল পয়েন্ট মাহবুবা খাতুন মিনু উপস্থিত ছিলেন। সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে আলোচনার কাঠামো চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে।
শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে জাপানি ভোক্তাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে জাপানি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি সরবরাহ চেইন গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা রপ্তানি আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া, জাপানের উচ্চমানের মানদণ্ডে মানিয়ে নিতে পারলে জুট, চা ও কৃষি পণ্যের রপ্তানি দিকেও নতুন বাজার উন্মুক্ত হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো বৈচিত্র্যপূর্ণ হবে, ফলে রপ্তানি নির্ভরতা একক গন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাপানীয় বাজারের উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা এবং গুণগত মানের প্রতি চাহিদা, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন বিক্রয় চ্যানেল তৈরি করবে। ফলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
তবে, শুল্কমুক্ত সুবিধা ব্যবহার করতে হলে বাংলাদেশি উৎপাদকদেরকে জাপানের কঠোর মানদণ্ড মেনে চলা আবশ্যক। পণ্যের গুণমান, প্যাকেজিং, লেবেলিং এবং সুরক্ষা মানদণ্ডে উন্নতি না করলে বাজারে প্রবেশের বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, লজিস্টিক্স ও শিপিং খরচের সঠিক পরিকল্পনা না করলে মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে মানদণ্ড উন্নয়ন, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং লজিস্টিক্স অবকাঠামো শক্তিশালী করার জন্য নীতি নির্ধারণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান করা হলে শুল্কমুক্ত সুবিধা থেকে সর্বোচ্চ লাভ অর্জন করা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, ইপিএ চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পর দুই-তিন মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সময়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র, শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একবার চুক্তি কার্যকর হলে, প্রথম শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুতি শুরু হবে, যা রপ্তানি শিল্পের উৎপাদন পরিকল্পনা ও বিক্রয় কৌশলে প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে বাংলাদেশি পণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, তবে মানদণ্ড মেনে চলা, লজিস্টিক্স ব্যবস্থাপনা এবং বাজার গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো আরও বৈচিত্র্যময় হবে।



