বাংলাদেশ ও জাপান আজ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) সংক্রান্ত আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একসাথে জানিয়েছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর উভয় পক্ষই নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে। এই সিদ্ধান্তটি দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হয়েছে।
চুক্তির আওতায় জাপান ৭,৩৭৯টি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি দেবে, যার মধ্যে বাংলাদেশি প্রস্তুত পোশাক শিল্পের পণ্যও অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে, বাংলাদেশ জাপানের ১,০৩৯টি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত প্রবেশের ব্যবস্থা করবে। এই সংখ্যাগুলি পূর্বের আলোচনার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উভয় দেশের রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্যকে সমন্বয় করার উদ্দেশ্য বহন করে।
শুল্কমুক্ত পণ্যের পাশাপাশি সেবা ক্ষেত্রেও চুক্তিতে ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ৯৭টি উপ-সেক্টরে সেবা প্রদান খুলবে, আর জাপান ১২০টি উপ-সেক্টরে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করবে। এই ব্যবস্থা উভয় দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেবে এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ভিত্তি গড়ে তুলবে।
EPA-র আলোচনার সূচনা হয়েছিল একটি যৌথ গবেষণা গোষ্ঠীর মাধ্যমে, যার প্রতিবেদন ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩-এ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ১৭টি সেক্টরকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এরপর ১২ মার্চ ২০২৪-এ আনুষ্ঠানিক আলোচনার সূচনা হয়, এবং প্রথম রাউন্ডটি ঢাকায় মে ২০২৪-এ অনুষ্ঠিত হয়। কিছু সময়ের জন্য আলোচনা থেমে গিয়েছিল, তবে নভেম্বর ২০২৪-এ ত্বরান্বিত সময়সূচি অনুসারে পুনরায় শুরু হয়।
পরবর্তী রাউন্ডগুলোতে ঢাকা ও টোকিও উভয় শহরে আলোচনা চালিয়ে গিয়ে, শেষ রাউন্ডটি টোকিওতে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত হয়। এই সপ্তম ও শেষ রাউন্ডে চুক্তির মূল পাঠ্য চূড়ান্ত করা হয় এবং পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সমাপ্তি ঘোষিত হয়। আলোচনার সমাপ্তি জানাতে বাণিজ্য উপদেষ্টা স্ক.বাশির উদ্দিন ফোনে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোটেগি তশিমিতসু সঙ্গে কথা বলে চুক্তির সমাপ্তি নিশ্চিত করেন।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে, শুল্কের অবসান আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, জাপানের উচ্চ মানের প্রযুক্তি ও পণ্যের প্রবেশে বাংলাদেশের বাজারে নতুন বিকল্প আসবে, যা ভোক্তা পছন্দের বৈচিত্র্য বাড়াবে।
জাপানের দিক থেকে, শুল্কমুক্ত প্রবেশের মাধ্যমে তাদের অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক্স এবং উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশি বাজারে এই পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপানি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগও সৃষ্টি হবে। ফলে উভয় দেশের বিনিয়োগ প্রবাহে উত্সাহ পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চুক্তির বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। শুল্কমুক্ত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, কাস্টমস প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সেবা সেক্টরে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সমন্বয় প্রয়োজন। এছাড়া, দু’দেশের মুদ্রা বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাণিজ্য প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব বিষয় সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ‑জাপান EPA চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গভীর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শুল্কমুক্ত পণ্য ও সেবা ক্ষেত্রের বিস্তৃত সুযোগ উভয় দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করবে। তবে চুক্তির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ধারাবাহিক নীতি সমন্বয় এবং পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য। ভবিষ্যতে এই চুক্তি উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।



