ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি তীব্র পরিবর্তনের মুখে পড়ে। শাসনের প্রথম মাসেই বহু দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়, যা আমদানি করের হারকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যায়। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল দেশীয় উৎপাদনশীলতা পুনরুজ্জীবিত করা এবং পতনশীল শিল্প ভিত্তি রক্ষা করা।
ইয়েল বাজেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষের দিকে গড় ট্যারিফ হার ৩% এর নিচে ছিল, আর ২০২৫ সালে তা প্রায় ১৭% এ পৌঁছায়। এই উচ্চ শুল্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে মাসে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়। শুল্কের এই তীব্রতা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তবে সরকার এটিকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি প্রয়োজনীয় ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করে।
শুল্কের প্রভাব কমাতে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় লিপ্ত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিগুলোতে ট্যারিফ হ্রাসের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে চীন সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি, যদিও ট্রাম্প এবং চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের মধ্যে বহুবার মুখোমুখি আলোচনা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি সীমিত থাকলেও, চীন তার বাণিজ্যিক অগ্রগতি বজায় রাখে। ট্রাম্পের শুল্কের পরেও চীনের বাণিজ্য ঘাটতি এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি পৌঁছায়, যা মূলত মার্কিন বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যান্য বাজারে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত হয়। পাশাপাশি, চীন তার উৎপাদন শৃঙ্খলকে উচ্চমূল্য যুক্ত পণ্যের দিকে স্থানান্তরিত করে মুনাফা বাড়াচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা দেখা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ১৫% শুল্ক আরোপ করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট রয়ে যায়। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বায়রু এই চুক্তিকে ‘সম্মতির কাজ’ এবং ইউরোপীয় ব্লকের জন্য ‘অন্ধকার দিন’ বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, কিছু ইউরোপীয় বিশ্লেষক এটিকে ‘সর্বনিম্ন ক্ষতিকারক’ বিকল্প হিসেবে স্বীকার করেন।
ইউরোপীয় রপ্তানিকারক ও অর্থনীতির ওপর শুল্কের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। বিভিন্ন ব্যতিক্রমী ধারার মাধ্যমে এবং বিকল্প বাজারে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে তারা নতুন সমন্বয় গড়ে তোলে। ফরাসি ব্যাংক সোসিয়েট জেনারাল অনুমান করে যে শুল্কের সরাসরি প্রভাব ইউরোপের মোট দেশীয় উৎপাদনের মাত্র ০.৩৭ শতাংশ। এই সংখ্যা নির্দেশ করে যে, যদিও শুল্কের চাপ রয়েছে, তা পুরো মহাদেশের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না।
চীনের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েও, তার অর্থনৈতিক কৌশল পরিবর্তন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের মুখে চীন তার রপ্তানি গন্তব্যকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করে, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নতুন বাজার তৈরি করে। তদুপরি, উৎপাদন প্রক্রিয়াকে উচ্চ মানের পণ্যের দিকে সরিয়ে চীন তার মূল্য সংযোজন বাড়াচ্ছে। এই কৌশল শুল্কের প্রভাবকে কমিয়ে দেয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করে।
২০২৬ সালে ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি কীভাবে বিকশিত হবে তা এখনও অনিশ্চিত। শুল্কের উচ্চ স্তর বজায় রাখা, নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করা প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে সরকারী নীতির মূল দিক।
বিশ্ব বাণিজ্যিক পরিবেশে এই পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি অন্যান্য দেশের বাণিজ্যিক কৌশলকে প্রভাবিত করবে, আর ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে নতুন সমঝোতা গড়ে তুলবে। ট্রাম্পের শাসনামলে গৃহীত এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



