বরিশালের বানারীপাড়া ও পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলাগুলো শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন ব্যবসায়িক গতি পায়। সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক উভয় ধরণের নার্সারি গড়ে উঠেছে, যেখানে শীতকালে ফুলের চারা উৎপাদনের কাজ শুরু হয়। এই চারা গুলো লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, বেগুনি ইত্যাদি রঙের নানা ফুলের জাত অন্তর্ভুক্ত, যা স্থানীয় বাজারে দ্রুত বিক্রি হয়।
বরিশাল বিভাগের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন চারা বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে, যার মোট মূল্য দশ কোটি টাকার উপরে পৌঁছাতে পারে। গত বছর চাহিদা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ফলে কিছু নার্সারিমালিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল, তবে এই বছর তারা উৎপাদন ক্ষেত্র বাড়িয়ে ক্ষতি পূরণে মনোযোগী।
বানারীপাড়া সদর দফতরের তেতলা ও নেছারাবাদ উপজেলার অলংকারকাঠি, কুনিয়ারী, মাহমুদকাঠি, সুলতানপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে নার্সারিগুলোর কর্মচাঞ্চল্য স্পষ্ট। গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা, গোলাপ, টিউলিপ, কসমস, বেলি, সূর্যমুখী, অর্কিড, সিলভিয়া, মর্নিং ফ্লাওয়ার, ক্যালেন্ডুলা সহ শতাধিক দেশি-বিদেশি জাতের চারা এখানে চাষ করা হয়। কর্মীরা চারা পরিচর্যা, সেচ, পলিথিন ব্যাগ, টব ও সিমেন্টের বস্তা ব্যবহার করে মাটি ভর্তি করে নতুন চারা রোপণের প্রস্তুতি নেয়।
এই দুই উপজেলায় অন্তত বিশটি গ্রাম জুড়ে একই রকম কর্মযজ্ঞ চলছে। এক নার্সারিমালিক উল্লেখ করেন, “সারা বছর বিভিন্ন ফলের চারা উৎপাদন করি, তবে শীতের আগে ফুলের বীজ বপন শুরু করি। তিন মাসের মধ্যে আমরা মূলত ফুলের চারা বিক্রিতে ব্যস্ত থাকি। প্রতি মৌসুমে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার বিক্রি হয়, যার অর্ধেকই লাভের অংশ।” এই বিবরণ থেকে দেখা যায়, ফুলের চারা ব্যবসা স্থানীয় কৃষকদের জন্য একটি স্থিতিশীল আয় উৎস হয়ে উঠেছে।
নেছারাবাদ উপজেলার কুড়িয়ানা গ্রামে আরেকজন নার্সারিমালিক জানান, “এই মৌসুমে প্রায় নব্বই শতাংশ জমি ফুলের চারা চাষে নিবেদিত করেছি। আশা করছি বিক্রয় দুই লাখ টাকার কাছাকাছি হবে।” একই সময়ে কর্মী রাহাত হোসেন উল্লেখ করেন যে, এখানে চারা মূল্যের পরিসর পঞ্চাশ টাকা থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে বনসাই ও বিদেশি জাতের চারা সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়।
বাজারের চাহিদা এবং উচ্চ মূল্যের কারণে এই অঞ্চলগুলোতে ফুলের চারা উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তারা এই ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমে বিনিয়োগ করছেন, ফলে সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া, নার্সারিগুলোর বিস্তৃতি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করছে; বহু তরুণ শ্রমিক এই কাজের মাধ্যমে আয় অর্জন করছে।
বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অনুমান অনুযায়ী, শীতকালে ফুলের চারা উৎপাদন এবং বিক্রয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা স্থানীয় কৃষি বাজারের গঠন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। তবে, চারা উৎপাদনের জন্য সেচ, রোগনাশক ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক প্যাকেজিংয়ের মতো প্রযুক্তিগত চাহিদা পূরণ না হলে বাজারের চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, সন্ধ্যা নদীতীরের গ্রামগুলো শীতকালে ফুলের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে একটি নতুন অর্থনৈতিক দিক তৈরি করেছে। প্রায় অর্ধকোটি চারা বিক্রির সম্ভাবনা এবং দশ কোটি টাকার বেশি আয় প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়িয়ে তুলবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে শক্তিশালী করবে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা বজায় রাখতে প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজার সংযোগ এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।



