আলজেরিয়ার জাতীয় সংসদ শনিবার একটি খসড়া আইন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যা ১৮৩০ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ফ্রান্সের উপনিবেশ শাসনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। এই প্রস্তাবটি দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনটি পাঁচটি অধ্যায়ে গঠিত, মোট ২৭টি ধারা নিয়ে গঠিত এবং আন্তর্জাতিক আইনের সেই নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা জনগণের আইনি প্রতিকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এতে উপনিবেশিক অপরাধের দায়িত্ব নির্ধারণ, স্বীকৃতি ও ক্ষমা চাওয়া, এবং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার অর্জনের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনটি জাতীয় স্মৃতির সুরক্ষা এবং ইতিহাসের সাথে পুনর্মিলনের ভিত্তি হিসেবে উপনিবেশিক অপরাধের স্বীকৃতি ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আইনটি আলজেরিয়ার স্বনির্ভরতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি দেশের অঙ্গীকারকে প্রকাশ করে।
সংসদে আইনটি উপস্থাপনকারী ইব্রাহিম বৌগালি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, এটিকে “আধুনিক আলজেরিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপটি দেশের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ, নৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক বার্তা, যা আলজেরিয়ার অম্লান অধিকার ও জনগণের ত্যাগের প্রতি আনুগত্যকে জোর দেয়।
বৌগালি আরও উল্লেখ করেন যে ফরাসি উপনিবেশ শাসন কেবল সম্পদ লুটপাটের সীমা অতিক্রম করে, তা ছিল ধারাবাহিক দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার নীতি, যা আদিবাসী মুসলিম জনগণকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছিল। এই নীতিগুলি আজও দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলছে।
প্রস্তাবিত আইনটি বুধবার ভোটের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। যদি সংসদ এটিকে অনুমোদন করে, তবে আলজেরিয়া ফরাসি উপনিবেশ শাসনের সময় সংঘটিত অপরাধগুলিকে আইনি দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এবং ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণ বা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার ভিত্তি তৈরি করবে।
ফ্রান্সের সরকার এখনো এই প্রস্তাবের প্রতি কোনো সরকারি মন্তব্য প্রকাশ করেনি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, এই ধরনের আইনি পদক্ষেপ দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং পারস্পরিক সংলাপের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।
আলজেরিয়ার অভ্যন্তরে এই আইনের সমর্থকরা এটিকে জাতীয় গর্বের প্রতীক এবং ইতিহাসের ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তারা দাবি করেন, উপনিবেশিক অতীতের স্বীকৃতি ছাড়া সত্যিকারের পুনর্মিলন সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক সতর্কতা প্রকাশ করছেন যে, এই আইনটি ফরাসি-আলজেরিয়ান সম্পর্কের বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা উচিত।
আইনের মূল উদ্দেশ্য হল উপনিবেশিক সময়কালে সংঘটিত মানবিক অপরাধের জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন নীতি পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এতে জাতীয় স্মৃতি সংরক্ষণ, শিকারের স্বীকৃতি এবং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার অর্জনকে কেন্দ্র করে একটি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
আলজেরিয়ার ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন, উপনিবেশ শাসনের সময় প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ অদৃশ্য হয়ে গেছেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছেন। এই সংখ্যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছে।
বৌগালির মতে, এই আইনটি শুধুমাত্র আইনি দিক নয়, বরং জাতীয় পরিচয় ও গর্বের পুনঃনির্ধারণের একটি প্রচেষ্টা। তিনি এটিকে “সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্বের প্রকাশ” বলে উল্লেখ করেন, যা আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়।
ভবিষ্যতে, যদি আইনটি পাশ হয়, তবে আলজেরিয়া ফরাসি সরকারকে ঐতিহাসিক অপরাধের স্বীকৃতি ও ক্ষমা চাওয়ার জন্য আইনি ভিত্তি তৈরি করবে। এটি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের সম্ভাবনা, ক্ষতিপূরণ দাবি এবং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।
এই প্রস্তাবের পরবর্তী ধাপ হবে সংসদের ভোট এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে সরকারী নীতি নির্ধারণ। উভয় দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



