ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্প ২০২৪ সালে রেকর্ড মাত্রায় বিক্রয় অর্জন করেছে। সরকার জানিয়েছে, গত বছর রপ্তানি আয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট এবং বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ চাহিদা পেয়েছে।
বিক্রয়ের অর্ধেকেরও বেশি ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত প্রধান গ্রাহক হিসেবে উল্লেখযোগ্য অর্ডার দিয়েছে। এই বৈশ্বিক বিতরণ ইসরায়েলকে বিশ্বের শীর্ষ দশটি অস্ত্র রপ্তানিকারকের মধ্যে স্থান দিয়েছে।
বিক্রয় বৃদ্ধির সময় ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বারা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ICJ) জেনোসাইডের অভিযোগ আনা হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেটানিয়াহু ও প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের ওয়ারেন্ট জারি করেছে।
বিশ্লেষক অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন ইসরায়েলি অস্ত্র রপ্তানির বৈশ্বিক আকর্ষণকে “অবৈধ কার্যকলাপকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ধারণা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা অনেক দেশের নজর কেড়েছে। একই সময়ে, শির হেভার, যিনি ইসরায়েলি অস্ত্র বাণিজ্যের বিশেষজ্ঞ, উল্লেখ করেছেন যে ক্রেতা দেশগুলো জানে যে এই সরঞ্জামগুলো গৃহীত সংঘাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটাচ্ছে, তবু তারা এই লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা নিষিদ্ধ।
বাজারের উত্থান সত্ত্বেও গাজা অঞ্চলের নাগরিকদের কষ্ট অব্যাহত। এক গাজা বাসিন্দা কারিম আল-বিরাওই জানিয়েছেন, তার মা ও তিনজন ভাইবোন গত বছর জাবালিয়ার ওসামা বেন জাইদ স্কুলে একটি কুয়াডকপ্টার আক্রমণে নিহত হয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেন, ড্রোনটি ঘরে প্রবেশ করে একটি লাল ঝলক দেখিয়েছে, এরপর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো ঘরকে অন্ধকারে ফেলে দেয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের আয় বৃদ্ধির ফলে দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধ এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত সমালোচনা রপ্তানি বাজারে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার নীতি অনুসারে, যুদ্ধাপরাধে জড়িত দেশের সঙ্গে সরাসরি অস্ত্র লেনদেন সীমিত করা হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বিক্রয় হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়ায়।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাজারে, বিশেষ করে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা বাজেট ইসরায়েলি সরঞ্জামের চাহিদা বাড়াচ্ছে। তবে ভারতও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার চাপের মুখে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে চুক্তি পুনর্বিবেচনার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ইসরায়েলি অস্ত্র শিল্পের রেকর্ড বিক্রয় তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা চাহিদার সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে। তবে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্ক রপ্তানি প্রবাহকে অনিশ্চিত করে তুলছে। শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কিভাবে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখবে, এবং কীভাবে ক্রেতা দেশগুলো আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে তার ওপর।
এই পরিস্থিতিতে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোকে কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে নয়, বরং নৈতিক ও আইনি দায়িত্বে মনোযোগ দিতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়।



