তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান শনিবার নৌ‑প্ল্যাটফর্ম কমিশনিং অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন যে, দেশের প্রতিরক্ষা ও বিমান শিল্পের রপ্তানি এই বছর প্রথম এগারো মাসে পূর্ব বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে রপ্তানি মূল্য ৭.৪৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা তুরস্ককে বিশ্বে রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে একাদশ স্থানে স্থাপন করেছে।
এ পর্যন্ত তুর্কি রপ্তানি বাজারে রেকর্ড করা এই বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হল সরকার‑নির্দেশিত রপ্তানি প্রণোদনা এবং উচ্চ মানের প্রযুক্তি‑ভিত্তিক পণ্যের চাহিদা। রপ্তানির প্রধান গন্তব্যে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার কিছু দেশ অন্তর্ভুক্ত, যেখানে যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক, নৌযান এবং সাইবার নিরাপত্তা সরঞ্জাম বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
এরদোয়ান উল্লেখ করেছেন যে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প কেবল পণ্য উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি ও শিল্প‑ভিত্তিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) থেকে শুরু করে সিরিয়াল উৎপাদন পর্যন্ত সব ধাপে দেশীয় সম্পদ ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে প্রতিটি প্রকল্পে স্থানীয় সরবরাহকারী ও স্টার্ট‑আপকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর করে তুলছে। ফলে তুর্কি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মূল্য‑সাশ্রয়ী এবং উচ্চ মানের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
এরদাওনের মতে, তুরস্ক এখন বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা নিজস্ব যুদ্ধজাহাজের নকশা, নির্মাণ ও উৎক্ষেপণে সক্ষম। এই সক্ষমতা দেশের নৌবাহিনীর স্বায়ত্তশাসন বাড়িয়ে দেয় এবং রপ্তানি পোর্টফোলিওতে নৌ‑প্রযুক্তি যুক্ত করে নতুন বাজার উন্মুক্ত করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তুরস্ক ইতিমধ্যে ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি বিমানবাহী রণতরীর নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। এই জাহাজটি তুরস্কের প্রথম অ্যামফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ, টিসিজি আনাদোলুর চেয়েও বড় হবে এবং বহুমাত্রিক সামরিক ও বাণিজ্যিক মিশন সম্পাদন করতে সক্ষম হবে।
নতুন রণতরী প্রকল্পের পাশাপাশি স্থল, আকাশ ও সাইবার ক্ষেত্রেও একাধিক আধুনিকীকরণ উদ্যোগ চালু করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্মের উন্নয়নে তুর্কি সংস্থাগুলোকে সরাসরি সরকারি তহবিল প্রদান করা হচ্ছে।
এই সব বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্যকে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে নয়, বরং শান্তি, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে। তাই রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য।
বাজার বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করছেন যে, রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে তুর্কি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর আয় ২০২৪ সালে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ইতিবাচক সংকেত। একই সঙ্গে, রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে তুর্কি লিরা-ডলারের রূপান্তর রেটের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কারণ বড় পরিমাণের বিদেশি মুদ্রা প্রবাহ দেশীয় মুদ্রার স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
বিনিয়োগকারীরা তুরস্কের প্রতিরক্ষা সেক্টরে নতুন সুযোগের সন্ধান করছেন, বিশেষ করে উচ্চ প্রযুক্তি উপাদান, সফটওয়্যার এবং সাইবার নিরাপত্তা সমাধানে। তুর্কি সরকারও বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের জন্য কর সুবিধা এবং প্রযুক্তি পার্টনারশিপের শর্ত সহজ করেছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা এবং ভূ‑রাজনৈতিক উত্তেজনা রপ্তানি বৃদ্ধির গতি ধীর করতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা তুর্কি কোম্পানিগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও বিমান শিল্পের ৩০ শতাংশ রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ৭.৪৪৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি মূল্য দেশের শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। দেশীয় প্রযুক্তি ভিত্তিক ইকোসিস্টেম গঠন, নতুন নৌযান প্রকল্প এবং বহুমুখী আধুনিকীকরণ উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ধারাবাহিকতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে, যদিও আন্তর্জাতিক নীতি ও বাজারের অস্থিরতা ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যাবে।



