সুদানের আবেই এলাকায় ১৩ ডিসেম্বর ড্রোন হামলায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিযুক্ত ছয়জন বাংলাদেশি সৈন্যের মধ্যে শামীম রেজা, রাজবাড়ীর হোগলাডাঙ্গি গ্রামবাসীর, নিহত হন। শামীমের দেহ ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে নিয়ে গিয়ে কালুখালি উপজেলার মিনি স্টেডিয়ামে শোকসভা অনুষ্ঠিতের পর, পরিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। দাফনের সময় গার্ড অফ অনার প্রদান, ত্রিপল শূন্য গুলি এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
শামীম রেজা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন এবং চলতি বছরের ৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশনে সুদানে পাঠানো হয়। আবেই এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে ১৩ ডিসেম্বর সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় তিনি এবং আরও পাঁচজন সহকর্মী প্রাণ হারান। শামীমের পরিবারে শোকের স্রোত অব্যাহত, তার মা‑বাবা ও ছোট ভাই সোহান ফকিরের কান্না থামছে না।
দাফনের দিন, রবিবার বিকাল চারটার দিকে শামীমের লাশ ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে তুলে নেওয়া হয়। হেলিকপ্টার থেকে লাশটি অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তর করে হোগলাডাঙ্গি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরিবারিক কবরস্থানে শোকের পরিবেশে বাবা‑মা, ভাই‑বোন ও আত্মীয়স্বজনের কান্না গর্জে ওঠে। শোকসভা শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শামীমকে গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয় এবং তিন রাউন্ড শূন্য গুলি ছোড়া হয়।
দাফনের পর, সেনা সদস্যরা শামীমের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শামীমের ছোট ভাই সোহান ফকির বলেন, “ভাইকে হারিয়ে গেছি, সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেব, আর কিছু বলার নেই।” পরিবারের এই বক্তব্যে শোকের পাশাপাশি সরকারী নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রতি স্বীকারোক্তি প্রকাশ পায়।
স্থানীয় প্রশাসনও শামীমের পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি জানায়। কালুখালি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামস সাদাত মাহমুদ উল্লাহ শামীমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে, তার আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং পরিবারকে সমবেদনা জানান। উপজেলা প্রশাসনও শোকের সময় পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার কথা পুনর্ব্যক্ত করে।
শামীমের মৃত্যুর পটভূমিতে সুদানের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশন (UNAMID) বহু বছর ধরে দেশের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা বজায় রাখতে কাজ করছে, তবে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা মিশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ সরকার শান্তি রক্ষাকারী মিশনে তার অবদান বজায় রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের আহ্বান জানাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সুদানে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। “ড্রোন হামলা শুধু সৈন্যদের নয়, স্থানীয় জনগণকেও বিপদের মুখে ফেলছে,” একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন। তিনি যোগ করেন, “বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য মিশনের ঝুঁকি ও সুবিধা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন ক্ষতি কমানো যায়।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সুদানে ঘটিত এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, শান্তি রক্ষাকারী মিশনের কার্যক্রমে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সুদানের সংঘাতের বিস্তৃতি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষাকারী মিশনের ওপর প্রভাবের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধরনের হামলা মিশনের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নীতিতে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে, ড্রোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিশনের নিয়মাবলী ও সুরক্ষা প্রোটোকল আপডেট করা প্রয়োজন।
শামীমের পরিবারে শোকের পাশাপাশি দেশের প্রতি গর্বের অনুভূতি দেখা যায়। তার বাবা‑মা, যাঁরা একমাত্র উপার্জনকারী সন্তান হারিয়েছেন, সরকারী সহায়তা ও সমর্থনের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। পরিবারিক দুঃখের পাশাপাশি, শামীমের ত্যাগকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় স্তরে শোকের অনুষ্ঠান ও স্মরণিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করা হতে পারে।
সুদানে শান্তি রক্ষাকারী মিশনের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে একত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, ড্রোন হুমকির মোকাবিলা এবং মিশনের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। শামীম রেজার ত্যাগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষাকারী মিশনের চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্বের পুনরায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।



