উদিচি শিল্পগোষ্ঠী আজ রোববার তার রাজধানী ঢাকা‑এর কেন্দ্রীয় অফিসের সম্পূর্ণ ধ্বংসের পর পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি জনসাধারণের দান ও স্বপ্রণোদনা ভিত্তিকভাবে নতুন ভবন গড়ে তুলবে এবং সরকার বা কর্পোরেট সংস্থার আর্থিক সহায়তা চাওয়ায় বিরত থাকবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সংগঠনের স্বনির্ভরতা ও সাম্প্রদায়িকতা‑বিরোধী নীতি রয়েছে।
উদিচি কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে আজকের ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পুনর্নির্মাণের জন্য কোনো সরকারি তহবিল বা বেসরকারি সংস্থার অনুদান গ্রহণ করা হবে না। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই পদক্ষেপটি সংগঠনের দীর্ঘদিনের স্বতন্ত্রতা ও স্বশাসনের ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
সংগঠনটি দাবি করে যে, স্বনির্ভরতা কেবল আর্থিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সাংস্কৃতিক অগ্রগতি রক্ষার জন্য সমষ্টিগত জনসাধারণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কমিউনালিজম ও উগ্রবাদের বিরোধিতা করার একটি কৌশল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা বিশ্বাস করে যে, জনগণের সমর্থনই তাদের মিশনের মূল চালিকাশক্তি।
গত সপ্তাহে ঘটিত হামলাটিকে উদিচি নেতারা দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ওপর এক আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত অফিসটি সংগঠনের কর্মসূচি, কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল; তাই এই ধ্বংসকে তারা হুমকি ও সহিংসতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন।
হামলার পরেও উদিচি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, হুমকি সত্ত্বেও সংগঠনটি তার সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ ও প্রকাশনা কাজ অব্যাহত রাখবে এবং কোনো ধরনের ভয়কে তাদের মিশনকে থামাতে দেবে না।
পুনর্নির্মাণের কাজের জন্য উদিচি সাংস্কৃতিক কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ জনগণের সহায়তা আহ্বান করেছে। তারা বলেছে, দান সংগ্রহের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করা হবে এবং তা স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা হবে। এই উদ্যোগে শিল্পী, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী সকলের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি সকল স্তরের মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধের আত্মা ও দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য একত্রিত হতে আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ও সমন্বয়ই এই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল ভিত্তি।
মাহমুদ সেলিম ও অমিত রঞ্জন দে আজকের ঘোষণায় উল্লেখ করেছেন যে, উদিচি দীর্ঘদিন থেকে স্বনির্ভরতা ও স্বশাসনের নীতি মেনে চলেছে এবং এই নীতি ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে। তারা আরও যোগ করেন যে, সংগঠনটি সরকারী সহায়তা না চেয়ে জনসাধারণের বিশ্বাস ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করে কাজ করবে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে উদিচি যে স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে চায়, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সরকারী সংস্থাগুলি এখনো এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে সংগঠনের এই স্বতন্ত্র পদক্ষেপকে কিছু বিশ্লেষক স্বতন্ত্র নাগরিক সমাজের শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কর্পোরেট সেক্টরের তহবিল প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে উদিচি আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে চায়। তারা দাবি করে যে, দান সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে হবে এবং দাতাদের নাম প্রকাশ না করে গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে।
উদিচি ইতিমধ্যে দান সংগ্রহের জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ইভেন্টের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। সংগঠনটি আশাবাদী যে, জনসাধারণের সমর্থন দ্রুতই পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করবে এবং নতুন অফিসের নির্মাণ কাজ শীঘ্রই শুরু হবে।
শেষে, উদিচি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সকলকে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, তারা এই পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় অবদান রাখুক। সংগঠনটি বিশ্বাস করে যে, সমষ্টিগত প্রচেষ্টা ও দানের মাধ্যমে তারা আবারও একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় অফিস গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যতে দেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



