পূর্বাচল নতুন শহরের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এসইউবি) তার সপ্তম সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজনের পর, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল প্রধান বক্তা হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত হন। তিনি উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অতিথিদের সামনে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য কী ধরনের গুণাবলি দরকার তা তুলে ধরেন।
ড. নজরুলের মতে, আজকের বিশ্বে শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়; বাস্তব দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আন্তর্জাতিক মঞ্চে টিকে থাকতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দক্ষতাকে কেবল লক্ষ্য হিসেবে না রেখে তা দৈনন্দিন অভ্যাসে রূপান্তর করা দরকার।
শৃঙ্খলাকে কেবল নীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ করতে হবে; দেশপ্রেমকে আবেগের স্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে আচরণে প্রকাশ করা উচিত, এ কথাগুলো তিনি উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করেন। এভাবে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার গঠনে আরও দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে পারবে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও, ড. নজরুল উল্লেখ করেন যে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক অর্জন সত্ত্বেও টেকসই প্রতিষ্ঠান গঠনে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বিশেষ করে পুলিশ, বিচার ও প্রশাসনের মতো মূল সংস্থাগুলোর গত দশকের দুর্বলতা তুলে ধরে বলছেন, এই সংস্থাগুলো এখন কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অগ্রগতি থেকে তিনি শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেন। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশ গঠন করা সম্ভব, আর যেসব দেশ এই মডেল অনুসরণ করেছে তারা দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশে ব্যক্তি ও পারিবারিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, ফলে অর্জিত সাফল্যগুলো টেকসই হয়নি।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সূচনাতেই ড. নজরুল শ্রীমতী ওসমান হাদির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর আত্মার মাগফিরাতের প্রার্থনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, হাদির মৃত্যুর পর তিনি কখনো এত বড় শোকের দৃশ্য দেখেননি এবং উপস্থিত মানুষের দোয়া ও আহার‑যাত্রা দেখে তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে যে আল্লাহ হাদিকে সর্বোচ্চ স্বর্গে স্থান দেবেন।
হাদির চরিত্রকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে ড. নজরুল বলেন, তিনি কখনো নিজের স্বার্থে কাজ করেননি, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার সৎ জীবনযাপন ও সকলকে ভালোবাসার মনোভাবকে তিনি বহু নেতার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ, যিনি গ্র্যাজুয়েটদের প্রশংসা করে বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরা মেধাবী ও সাহসী, কারণ জ্ঞানার্জন এখন কেবল বইয়ের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার পরিসরও বিস্তৃত হচ্ছে, যা নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
ড. ফায়েজের মন্তব্যের পর ড. নজরুল আবারও জোর দেন, শিক্ষার্থীদের উচিত তত্ত্বের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা। তিনি বলেন, কর্মশালা, ইন্টার্নশিপ এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তব জগতের চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত হওয়া সম্ভব।
এই বক্তব্যের পর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রথমত, শিক্ষার সময় অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত করা; দ্বিতীয়ত, স্ব-শৃঙ্খলা গড়ে তোলা এবং সময় ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নত করা; তৃতীয়ত, দেশপ্রেমকে কর্মে রূপান্তরিত করা, যাতে সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যায়।
ড. নজরুলের শেষ মন্তব্যে তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সফল হতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, ধারাবাহিক দক্ষতা ও নৈতিকতা দরকার। তিনি উপস্থিত সকলকে এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানান এবং শিক্ষার মাধ্যমে দেশের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানটি শ্রীমতী ওসমান হাদির স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয় এবং উপস্থিত সকলের কাছ থেকে গভীর সম্মান ও কৃতজ্ঞতা পায়। অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীরা একত্রে হাদির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সমাপনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।



