সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের চর খোকশাবাড়ী হাইস্কুল মাঠে রবিবার বিকেলে রোল মডেল ফেয়ার ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়। এই আয়োজন রুরাল অ্যাডভোকেসি সার্ভিস ফর উইমেন ইমপাওয়ারমেন্ট প্রকল্পের অংশ হিসেবে, জার্মান কর্পোরেশনের আর্থিক সহায়তা এবং উত্তরন ও এফআইভিডব্লিউবির সমন্বয়ে আয়োজন করা হয়। ফেয়ারের মূল লক্ষ্য ছিল নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করা এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করা।
ইভেন্টে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থী, নারী উদ্যোক্তা এবং চারটি ইউনিয়নের (খোকশাবাড়ী, গৌরবপুর, রামপুরা, মির্জাপুর) নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা শাক-সবজি চাষ, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি বিভিন্ন সেক্টরে তাদের অভিজ্ঞতা ও পণ্য প্রদর্শন করেন।
স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মমিনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মনজুরে মওলা উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া খোকশাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. সাইদী রহমান, উত্তরনের অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর সাইদুর রহমান, এফআইভিডব্লিউবির প্রকল্প কো-অর্ডিনেটর নুরুল ইসলাম, স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, সমাজসেবার সহকারী পরিচালক খন্দকার গোলা সরোয়ার, বারটানের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ডা. আব্দুল মজিদ এবং উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন মিরাজ হোসেন মিসবা বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেছিলেন যে নারীর ক্ষমতায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারীরা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়। শিক্ষা, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং আত্মনির্ভরশীলতা এই প্রক্রিয়ার মূল স্তম্ভ। এ ধরনের সচেতনতা নারীর নেতৃত্ব গড়ে তুলতে, ন্যায়বিচার ও সততার পরিবেশ তৈরি করতে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করে।
প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ নারীদের জন্য শাক-সবজি উৎপাদনসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যগুলোর বাজারজাতকরণ সহজ করার জন্য স্থানীয় বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে সংহত করা হচ্ছে। ফলে নারীরা তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বাড়িয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবে।
অনুষ্ঠানে নারী উদ্যোক্তারা তাদের স্টল থেকে তৈরি পণ্যগুলো সরাসরি দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেন। শাকসবজি, হস্তশিল্প, প্যাকেজড খাবার এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলো বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করে। দর্শকরা পণ্যের গুণমান ও মূল্য সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছেন।
ফেয়ারের সময় শিক্ষার্থীরা নারীর ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা দক্ষতা সম্পর্কে কর্মশালা ও আলোচনা সেশনে অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের জন্য এই ধরনের ইন্টারেক্টিভ সেশন ভবিষ্যতে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
উত্তরন ও এফআইভিডব্লিউবির প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন যে, এই ধরণের ইভেন্টগুলো গ্রামীণ নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং তাদের পণ্যকে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ভবিষ্যতে আরও বেশি ইউনিয়নে এ ধরনের ফেয়ার আয়োজনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় প্রশাসনও ফেয়ারকে সমর্থন জানিয়ে বলেছে যে, নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে এমন উদ্যোগগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তারা ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে আরও ব্যাপক কর্মসূচি চালু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
ফেয়ার সমাপ্তির পর অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন। নারী উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতে সহযোগিতা ও সমবায় উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা শেয়ার করেন। এই ধরনের সংযোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করে।
সিরাজগঞ্জে রোল মডেল ফেয়ার ২০২৫ নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইভেন্টের সাফল্য দেখিয়ে দেয় যে, সঠিক সমর্থন ও পরিকল্পনা থাকলে গ্রামীণ নারীরা স্বনির্ভর হয়ে সমাজে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
আপনার যদি নিজের বা পরিচিত কোনো নারী উদ্যোক্তার গল্প থাকে, তবে স্থানীয় সংস্থা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন; এভাবে সমষ্টিগত জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে ওঠে এবং আরও বেশি নারী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।



