জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান ২১ ডিসেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটে অনুষ্ঠিত আয়কর রিটার্ন দাখিল সাপোর্টিং বুথের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ই-রিটার্ন সিস্টেমে ব্যাংকিং তথ্য যুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আগামী বছর থেকে এই সংযোজনের মাধ্যমে কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সহজ হবে।
বুথের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মকর্তারা ও করদাতারা নতুন প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। চেয়ারম্যানের মতে, ই-রিটার্নে ব্যাংকিং তথ্য সংযোজনের ফলে রিটার্নের সত্যতা যাচাই দ্রুত হবে এবং তথ্যের বিকৃতি কমে যাবে।
সিস্টেমের আপডেটের অংশ হিসেবে আগামী বছর নতুন অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হবে, যা করদাতাদের মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে সরাসরি রিটার্ন দাখিলের সুবিধা দেবে। এই অ্যাপগুলোতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিঙ্ক হবে, ফলে ম্যানুয়াল ডেটা এন্ট্রি কমে যাবে।
চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, বর্তমান করবর্ষে (২০২৫-২৬) অনলাইনে প্রায় ২৬ লক্ষ রিটার্ন দাখিল হয়েছে। দৈনিক গড়ে প্রায় ৫০,০০০ করদাতা ই-রিটার্নের মাধ্যমে তাদের কর দাখিল করছেন, যা পূর্বের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
অনলাইন রিটার্ন দাখিলের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারী আয়েও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চেয়ারম্যানের মতে, সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর সংগ্রহ ও অডিট প্রক্রিয়া উভয়ই দ্রুত এবং স্বচ্ছ হবে, যা কর ফাঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
ব্যাংকিং তথ্যের সংযোজনের ফলে করদাতাদের আয় ও ব্যয়ের তথ্য সরাসরি যাচাই করা সম্ভব হবে, ফলে তথ্যের বিকৃতি ও ম্যানুয়াল ত্রুটি কমে যাবে। এটি করদাতাদের জন্যও সুবিধাজনক, কারণ রিটার্নে ভুল তথ্যের কারণে অতিরিক্ত জরিমানা বা কর পুনরায় হিসাব করার ঝামেলা কমে যাবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই পদক্ষেপটি আর্থিক সেবা খাতের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে। ব্যাংক ও ফিনটেক কোম্পানিগুলোকে ই-রিটার্নের সাথে ইন্টিগ্রেশন করার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান প্রদান করতে হবে, যা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ডেটা সিকিউরিটি সেবার চাহিদা বাড়াবে।
অন্যদিকে, ডেটা সিকিউরিটি ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ব্যাংকিং তথ্যের বৃহৎ পরিমাণ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে, তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, ই-রিটার্নে ব্যাংকিং তথ্য সংযোজনের জন্য বিদ্যমান আইটি অবকাঠামোকে আপডেট করা এবং নতুন সফটওয়্যার মডিউল ইন্টিগ্রেট করা হবে। এই কাজের জন্য অতিরিক্ত বাজেট ও মানবসম্পদ প্রয়োজন হতে পারে, যা আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
করদাতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বয়ংক্রিয় ডেটা লিঙ্কের ফলে রিটার্ন দাখিলের সময় কমে যাবে এবং ত্রুটি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই সুবিধা উল্লেখযোগ্য, কারণ তারা কম সময়ে সঠিক রিটার্ন দাখিল করতে পারবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, ই-রিটার্নের এই আপডেট দীর্ঘমেয়াদে করভিত্তি বিস্তৃত করতে সহায়ক হবে। স্বচ্ছতা বাড়ার ফলে করদাতাদের মধ্যে স্বেচ্ছায় কর প্রদান বাড়তে পারে, যা সরকারি আয় স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে, সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা অর্জনের জন্য ব্যবহারকারীর সচেতনতা ও প্রশিক্ষণও অপরিহার্য। সরকারী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে রিটার্ন দাখিলের নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য প্রচার ও ব্যবহারিক নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, ই-রিটার্নে ব্যাংকিং তথ্য সংযোজনের পরিকল্পনা কর ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে ত্বরান্বিত করবে এবং আর্থিক বাজারে ডিজিটাল রূপান্তরের নতুন ধাপ হিসেবে কাজ করবে। এই পরিবর্তনটি কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াবে, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি করবে।
সংক্ষেপে, আগামী বছর থেকে ই-রিটার্নে ব্যাংকিং তথ্য যুক্ত করা, নতুন অ্যাপের মাধ্যমে দাখিল সহজ করা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর প্রক্রিয়া গড়ে তোলার উদ্যোগটি করদাতা, ব্যাংক ও ফিনটেক শিল্পের জন্য সমন্বিত সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে আসবে। সফল বাস্তবায়ন হলে সরকারী আয় বৃদ্ধি, কর ফাঁকি হ্রাস এবং আর্থিক সেবার ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত হবে।



