ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দে সিলভা শনিবার ফোজ দো ইগুয়াসুতে অনুষ্ঠিত মারকোসুর শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। লুলা উল্লেখ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা বিশ্বে একটি বিপজ্জনক উদাহরণ স্থাপন করবে, যা লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের সৃষ্টি করবে।
এই মন্তব্যের পটভূমিতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে তিনি ভেনেজুয়েলা থেকে বেরিয়ে আসা এবং দেশের জ্বালানি সীমা অতিক্রম করা তেল ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও তাদের ‘অবরোধ’ করার আদেশ দেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলায় তেল সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে এবং অঞ্চলের রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্রতর হচ্ছে।
লুলার সতর্কবার্তা লাতিন আমেরিকার দুই বৃহত্তম অর্থনীতির নেতাদের, ব্রাজিল ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টদের কাছেও পৌঁছেছে। উভয় দেশই বর্তমান পরিস্থিতিতে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে, কোনো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। লুলা বিশেষ করে উল্লেখ করেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর চার দশকেরও বেশি সময় কেটে যাওয়া সত্ত্বেও, এখন আবার একটি বহিরাগত শক্তির সামরিক উপস্থিতি দক্ষিণ আমেরিকায় গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মারকোসুর সম্মেলনের পর, লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ একত্রে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে তারা ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য শান্তিপূর্ণ উপায় অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা পুনর্ব্যক্ত করে। এই ঘোষণায় আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং পানামার প্রেসিডেন্টদের পাশাপাশি বলিভিয়া, ইকুয়েডর এবং পেরুর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও স্বাক্ষর করেছেন।
লুলার বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি এমন কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলার সরকার ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়তে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে।
অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও এই পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউম ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলায় মানবিক সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং কোনো সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রত্যাখ্যানের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। ব্রাজিলের এই অবস্থান, বিশেষ করে লুলার স্পষ্ট সতর্কতা, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সময়ে তেল রপ্তানি ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও তেল ট্যাঙ্কারদের ‘অবরোধ’ আদেশের ফলে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, যা দেশের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলবে। লুলা উল্লেখ করেন, এই ধরনের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা মিলে, ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
লুলা এবং অন্যান্য লাতিন আমেরিকান নেতাদের যৌথ বিবৃতি, ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন দাবি করে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিষয়ে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে এবং কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নিতে আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, তারা ভেনেজুয়েলার সরকারকে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার পরামর্শ দিয়েছে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে লাতিন আমেরিকান দেশগুলো সম্ভবত ভেনেজুয়েলার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন, যদি ঘটে, তবে তা লাতিন আমেরিকায় তার কূটনৈতিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। লুলার সতর্কতা এবং লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



