ইসরায়েলি নিরাপত্তা কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুনরায় আলোচনার মুখে। ব্রিটিশ সম্প্রচার সংস্থা বিবিসির একটি প্রতিবেদনে যৌন নিগ্রহ, শারীরিক আক্রমণ এবং অপমানের দৃশ্য প্রকাশ পেয়েছে। জাতিসংঘের টরচার বিরোধী কমিটি এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে বলছে যে সব কার্যক্রম আইনগত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে কারাগারে আটক থাকা ফিলিস্তিনি বন্দীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রশাসনিক আটক (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন) এর মাধ্যমে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা হয়।
একজন ফিলিস্তিনি বন্দী জানান, তাকে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জ ছাড়াই ১৬ মাসের জন্য আটক রাখা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, কারাগারের রক্ষীরা নিয়মিত শারীরিক হিংসা ব্যবহার করে এবং ভয় দেখিয়ে শাসন চালায়। একই সময়ে, আরেকজন বন্দী ৭ অক্টোবরের একটি ঘটনার সমর্থনে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার পর আটক হয় এবং শারীরিক অপমানের শিকার হন।
২০২৪ সালে এক সামরিক কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ওই ফুটেজে একটি ফিলিস্তিনি বন্দীর ওপর শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্য দেখা যায়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই ঘটনার পর পাঁচজন ইসরায়েলি সৈন্যের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
আইনি প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, ইসরায়েলি ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযুক্ত সৈন্যদের সমর্থন জানিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করে। একটি জরিপে দেখা যায়, বেশিরভাগ ইসরায়েলি নাগরিক গাজার বন্দীদের ওপর নির্যাতনের মামলায় সৈন্যদের বিচার না হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলি কারাগারে বর্তমানে ফিলিস্তিনি বন্দীর সংখ্যা ৯,০০০ অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) নেই। জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা কারাগারের ভয়াবহ অবস্থা এবং বন্দীদের ওপর সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাষ্ট্রদূত এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং ইসরায়েলকে মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আটককারীদের অধিকার সুরক্ষিত করা অপরিহার্য।
একজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ কেবল স্থানীয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি বলেন, এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার সংস্থার হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
ইসরায়েলি সরকার এখনও এই অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে সব কার্যক্রম নিরাপত্তা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। তবে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ এবং আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ইসরায়েলকে তার কারাগার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতি গাজার অঞ্চলে ইতিমধ্যে চলমান সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়মিত উঠে আসে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, গাজার পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলি কারাগারের অবস্থা পারস্পরিকভাবে প্রভাবিত করে, যা সমাধানের জন্য বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার গোষ্ঠী এখন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং আটককারীদের শর্তাবলী উন্নত করতে চাপ দিচ্ছে। তারা দাবি করে, কোনো ধরনের শারীরিক বা যৌন নির্যাতন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সম্পর্কের কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুসারে, আন্তর্জাতিক আদালত এবং মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি কারাগারের নীতি ও প্রয়োগে পরিবর্তন আনতে পারে।



