আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১ (আইসিটি‑১) গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে দায়ের করা মামলায় শ্রীমতি শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং দশজন সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরুর আদেশকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
বিচারিক প্যানেলটি আইসিটি‑১ এর চেয়ারম্যান মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বে গঠিত, অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। প্যানেলটি আজ (২১ ডিসেম্বর) রোববার সকাল ১০টায় গ্রেপ্তারকৃত দশজন সেনা কর্মকর্তাকে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করে শুনানির সূচনা করে।
শুনানিতে প্রতিরক্ষাকারী আইনজীবীরা পৃথকভাবে যুক্তি উপস্থাপন করে তাদের মক্কেলদের দোষমুক্তি বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। তিনজন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ যুক্তি দেন, আর বাকি সাতজনের পক্ষে আইনজীবী তাবারক হোসেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের পক্ষে এম হাসান ইমাম এবং বাকি তিনজনের পক্ষে আইনজীবী সুজাদ মিয়া যুক্তি প্রদান করেন। প্রতিরক্ষার মূল দাবি হল গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগের ভিত্তি অপর্যাপ্ত এবং প্রমাণের স্বচ্ছতা অনুপস্থিত।
প্রসিকিউশন পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী গাজী এম এইচ তামিম প্রমাণের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে বিচার শুরু করার আবেদন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, র্যাবের টিএফআই সেলে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে বিশদভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
গত ৩ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম একই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির সমাপ্তি জানান। তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে টিএফআই সেলে ঘটিত গুম ও নির্যাতনের ভয়াবহ দৃশ্যাবলি তুলে ধরেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এই ভিত্তিতে আদালত আজকের শুনানিতে অভিযোগ গঠনের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করে ২৩ ডিসেম্বর।
আজ উপস্থিত দশজন সেনা কর্মকর্তার মধ্যে র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ এবং কর্নেল আবদুল্ সহ আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগের ভিত্তিতে ফরমাল চার্জ গঠন করা হবে বলে আদালত আজ সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগের প্রমাণের যথার্থতা ও প্রক্রিয়াগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা দাবি করেন যে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে গৃহীত তদন্তের পদ্ধতি স্বচ্ছ নয় এবং প্রমাণের মূলসূত্রে ত্রুটি রয়েছে। অন্যদিকে প্রসিকিউশন দল টিএফআই সেলে ঘটিত অপরাধের বিশদ বিবরণ, শিকারদের সাক্ষ্য এবং অন্যান্য ডকুমেন্টেশনকে ভিত্তি করে অভিযোগ গঠনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।
আইসিটি‑১ এর প্যানেল এখন পর্যন্ত শ্রীমতি শেখ হাসিনা ও অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের জন্য নির্ধারিত তারিখ ২৩ ডিসেম্বরের দিকে অগ্রসর হয়েছে। এই তারিখের পর ফরমাল চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে, মামলাটি মূল বিচার পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে, আইসিটি‑১ গুম ও নির্যাতনের অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শাস্তি নির্ধারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবে। বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে শ্রীমতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই মামলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত দেশের মানবাধিকার রেকর্ডের উপরও প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তবে বর্তমান পর্যায়ে আদালত কেবল অভিযোগ গঠনের সময়সূচি নির্ধারণ করেছে, বিচার ও রায়ের সময়সীমা এখনও অজানা।
সারসংক্ষেপে, গুম ও নির্যাতনের মামলায় শ্রীমতি শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিক, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং দশজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত হয়েছে, এবং ফরমাল চার্জ গঠনের প্রক্রিয়া শীঘ্রই শুরু হবে।



