ফেনী শহরের কেন্দ্রের ট্রাংক রোড থেকে প্রায় এক‑দেড় কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত উত্তর বিরিঞ্চি এলাকায় রিকশা ভাড়া প্রায় ৩০ টাকা, শেয়ার অটো‑রিকশা ১০ টাকা। এই এলাকায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ইটের তৈরি দীর্ঘ রাস্তা দেখা যায়, যা একদম শেষের মতো মনে হলেও বাড়িঘরের সীমানা পার করলে আবার পুরনো ইটের পথ পুনরায় দেখা যায়। রাস্তার দু’পাশে কখনো কখনো অবারিত ধানের ক্ষেতের দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়ে দেন যে এই রাস্তা সাধারণ পথ নয়; এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ‑আমেরিকান মিত্রবাহিনীর অন্যতম বড় বিমানঘাঁটির রানওয়ে ছিল।
বিমানঘাঁটি ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্সের দশম বিমানবাহিনীর অধীনে নির্মিত হয় এবং বার্মা অভিযান (মায়ানমার) সময় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা পালন করে। ঐ সময়ের সরকারি রেকর্ডে উল্লেখ আছে যে ফেনী বিমানঘাঁটি দশম বিমানবাহিনীর দ্বাদশ বোমারু দলের প্রধান ঘাঁটি ছিল এবং জুলাই ১৯৪৪ থেকে জুন ১৯৪৫ পর্যন্ত এখানে থেকে নিয়মিত যুদ্ধ মিশন চালানো হতো। মাঝারি পাল্লার বোমারু বিমান ব্যবহার করে বার্মায় জাপানি সেনাবাহিনীর অবস্থানকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হতো।
এই ঘাঁটি শুধুমাত্র বোমারু বিমান নয়, এয়ার ডিফেন্সের জন্য বড় ক্যানন এবং যোগাযোগের বিভিন্ন সরঞ্জামও স্থাপন করা হয়েছিল। যুদ্ধের শেষের দিকে, জাপানি বাহিনীর অগ্রগতি থামাতে এবং মিত্রবাহিনীর আক্রমণাত্মক কৌশলকে সমর্থন করতে এই অবকাঠামো অপরিহার্য ছিল। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ফেনীর মতো ছোট শহরে এমন বড় মিত্রবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করা মিত্রশক্তির দক্ষিণ এশিয়ায় লজিস্টিক্স ও রিফুয়েলিং নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করেছিল, যা বার্মা ক্যাম্পেইনের সফলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে।
যুদ্ধের পর থেকে এই বিমানঘাঁটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছে। প্রায় সাড়ে তিনশ একর জমিতে ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল; আজ সেই জমিতে কৃষিকাজ, বাড়িঘর এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্মরণ করেন, এক সময় এখানে বিমান উড়ে যেত, ক্যাননের গর্জন শোনা যেত; তবে আজ সেই শব্দ আর শোনা যায় না। ঘাঁটির পুরনো রেলওয়ে ও রানওয়ের অংশ এখন কৃষি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে, এবং কিছু অংশে এখনও ইটের পুরনো পথ দেখা যায়, যা অতীতের স্মৃতি বহন করে।
ফেনী বিমানঘাঁটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুনরায় আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের প্রকাশনায় উল্লেখ আছে যে এই ঘাঁটি বার্মা অভিযানের সময় মিত্রবাহিনীর কৌশলগত পরিকল্পনার একটি মূল উপাদান ছিল। একই সঙ্গে, ব্রিটিশ সামরিক আর্কাইভে দেখা যায় যে এই ঘাঁটি ব্রিটিশ‑আমেরিকান যৌথ অপারেশনের সমন্বয়মূলক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা যুক্তি দেন, ফেনীর মতো স্থানীয় অবকাঠামো মিত্রশক্তির আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে সহায়তা করে।
আজকের দিনে ফেনী বিমানঘাঁটির অবশিষ্টাংশ স্থানীয় ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত হচ্ছে, যদিও কোনো সরকারি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় নয়। কিছু গবেষক প্রস্তাব করেন, এই ঐতিহাসিক সাইটকে স্মারক পার্কে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের মিত্রবাহিনীর কৌশলগত অবদান সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। তবে, বর্তমানে এখানে কৃষিকাজ এবং বাসস্থানই প্রধান কার্যক্রম।
ফেনী বিমানঘাঁটির গল্প কেবল স্থানীয় স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তির দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে তোলা সামরিক নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক গবেষণায় এই ধরনের সাইটের বিশ্লেষণ মিত্রশক্তির কৌশলগত পরিকল্পনা, লজিস্টিক্স এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির মূল্যায়নে সহায়তা করে। ভবিষ্যতে, ঐতিহাসিক গবেষণা ও স্থানীয় সংরক্ষণ উদ্যোগের সমন্বয়ে ফেনীর এই পুরনো বিমানঘাঁটি আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হতে পারে।



