গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্বেচ্ছায় প্রস্থানকে সমর্থন করার দাবি করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নতুন উদ্যোগে গত মাসে ১৫৩ জনের একটি দলকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া একটি গোপনীয় বিমান সেবা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই অপারেশনটি আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে একটি অনিবন্ধিত সংস্থা “আল-মাজদ ইউরোপ” এর ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েল গাজার সামরিক অভিযান থেকে ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদে ব্যর্থ হওয়ার পর বিকল্প কৌশল অনুসন্ধান করেছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, তারা মানবিক উদ্দেশ্য দাবি করে গোপনীয়ভাবে গাজা বাসিন্দাদের দেশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে, যদিও বাস্তবে তা জোরপূর্বক বহিষ্কারের একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিজিটাল তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, গত মাসে একটি অজানা বিমান গাজা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার ওআর টাম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৩ নভেম্বর অবতরণ করেছে। এ যাত্রায় ১৫৩ জন ফিলিস্তিনি যাত্রী ছিলেন, যাদের গন্তব্যস্থল হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানটি কোন সরকারি সংস্থার মালিকানায় ছিল তা স্পষ্ট নয়, তবে এর পেছনে “আল-মাজদ ইউরোপ” নামের একটি সংস্থা কাজ করেছে বলে জানা যায়।
“আল-মাজদ ইউরোপ” একটি অনিবন্ধিত সংগঠন, যা মানবিক কাজের নামেই গাজা থেকে প্রস্থানকে সহজ করার দাবি করে। সংস্থাটি ২০১০ সালে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত একটি ফাউন্ডেশন হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে এবং এর প্রধান কার্যালয় পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাতে অবস্থিত বলে দাবি করা হয়েছে। তবে জার্মান ও ইউরোপীয় কোনো সরকারি রেজিস্ট্রিতে এই নামের কোনো সংস্থা পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ আফ্রিকান রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা এই ঘটনার পর তার সরকারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। রামাফোসা উল্লেখ করেন, গাজা থেকে প্রস্থান করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা পূর্বে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্বেচ্ছায় অভিবাসনকে সমর্থন করা তাদের নীতি, যা বাস্তবে জোরপূর্বক উচ্ছেদের একটি রূপ হিসেবে কাজ করছে। এই নীতির ভিত্তিতে, ২০২৫ সালের মার্চে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা একটি বিশেষ ব্যুরো গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপ-পরিচালক যাকভ ব্লিটস্টাইন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের মতে, গাজার প্রায় ৪০ শতাংশ বাসিন্দা অভিবাসনের প্রতি আগ্রহী। এই সংখ্যা সরকারী নথিতে উল্লেখিত হলেও, বাস্তবিকভাবে কতজন প্রস্থান করতে সক্ষম হবে তা এখনও অনিশ্চিত।
আল-মাজদ ইউরোপের নতুন ওয়েবসাইটে দেখা যায়, তারা মুসলিম দেশগুলোতে ত্রাণ কাজের ওপর জোর দেয় এবং বিশেষ করে গাজা থেকে প্রস্থান করতে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের জন্য সহায়তা প্রদান করে বলে দাবি করে। ওয়েবসাইটে উল্লেখিত ঠিকানাটি জেরুজালেমের সরকারি রেকর্ডেও পাওয়া যায় না, এবং গুগল ম্যাপে কোনো সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করা যায়নি।
আল-জাজিরা এই সংস্থার কোনো সরকারি নিবন্ধন বা স্বীকৃতি খুঁজে পায়নি, যা সংস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। সংস্থার দাবি অনুযায়ী, তারা জার্মানিতে নিবন্ধিত এবং পূর্ব জেরুজালেমে সদর দপ্তর রয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রিগুলোতে এ ধরনের কোনো এন্ট্রি নেই।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েল-গাজা সম্পর্কের নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। গাজার বাসিন্দাদের স্বেচ্ছায় প্রস্থানকে সমর্থন করার দাবি এবং বাস্তবে জোরপূর্বক বহিষ্কারের সম্ভাবনা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ও দেশীয় সরকারগুলো সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবতরণ করা ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে, এবং ইসরায়েলি নীতি কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তা পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে, আল-মাজদ ইউরোপের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে গাজার মানবিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গাজার বাসিন্দাদের অধিকার, স্বেচ্ছায় প্রস্থান এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের সীমা নির্ধারণে নতুন আলোচনার দরজা খুলে গেছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের নীতি গৃহীত হবে এবং তা গাজার জনগণের উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



