একটি ফেসবুক পেজ ‘প্রজ্ঞা’ অনলাইন বাজারে নকল বই বিক্রির মাধ্যমে প্রকাশক ও লেখকদের ক্ষতি করছে। একই পেজে মূল মূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে বই বিক্রি করা হচ্ছে, ফলে পাঠকরা আসল‑নকল পার্থক্য না বুঝে সস্তা বিকল্প বেছে নিচ্ছেন।
ঝানু আমলা আকবর আলি খান রচিত ‘অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইটির মূল দাম ৮৫০ টাকা, তবে ‘প্রজ্ঞা’ পেজে একই শিরোনামের কপি মাত্র ৪২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাগজের মান ও মুদ্রণের গুণগত মান মূল সংস্করণের তুলনায় কম হলেও পৃষ্ঠার নকশা ও কন্টেন্ট একই রকম দেখায়, ফলে গ্রাহকরা প্রায়ই বিভ্রান্ত হন।
‘প্রজ্ঞা’ পেজটি ফেসবুকের বিজ্ঞাপন টুল ব্যবহার করে নকল বইয়ের প্রচার করে, যেখানে কম দামের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঠকদের আকৃষ্ট করা হয়। পেজের পরিচালনাকারীরা মূল প্রকাশকের অনুমতি ছাড়াই কপিকৃত সংস্করণ তৈরি করে বিক্রি করে, এবং বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থে কোনো রয়্যালটি প্রদান করে না।
এই নকলের পরিসর একক শিরোনামেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকাশকরা জানিয়েছেন যে একই পেজে বহু ভলিউমের বইয়ের নকল বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথমা প্রকাশনীর ‘প্রতিনায়ক সিরাজুল আলম খান’ মূল দামে ৮৮০ টাকা, কিন্তু ‘প্রজ্ঞা’তে তা ৪৪০ টাকায় পাওয়া যায়। একই লেখকের ‘লালসন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’ বইয়ের মূল দাম ৮০০ টাকা, নকল সংস্করণে দাম ৪০০ টাকা।
বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (তিন খণ্ড) ও ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ (দুই খণ্ড) মূল দামে মোট ৫,১০০ টাকা, তবে ‘প্রজ্ঞা’ পেজে এই সেটগুলো মাত্র ২,৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বহু খণ্ডের বইয়ের ক্ষেত্রে নকলের দাম মূল মূল্যের অর্ধেকের কাছাকাছি, যা পাঠকদের জন্য বড় আকর্ষণ তৈরি করছে।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের পাঁচটি বই—‘বাদশাহ নামদার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘শুভ্র’ ও ‘কবি’—এর একটি প্যাকেজ ‘প্রজ্ঞা’তে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এই বইগুলোর একক দামের তুলনায় এই মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম, ফলে নকলের চাহিদা বাড়ছে।
প্রথমা প্রকাশনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নকল বইয়ের দাম এত কমে রাখা সম্ভব নয় যদি গুণগত মান বজায় রাখা হয়। প্রকাশনা সংস্থা বইয়ের মুদ্রণ, কাগজ, ডিজাইন ও বিতরণে লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে, আর নকল চক্র কোনো রয়্যালটি না দিয়ে সম্পূর্ণ চুরির মাধ্যমে লাভ করে। এই ধরনের অবৈধ কার্যক্রম প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও সাহিত্যিক পরিবেশের স্বচ্ছতা নষ্ট করে।
পাবলিক তথ্য অনুযায়ী, ‘প্রজ্ঞা’ পেজের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় একটি জিডি (জেনারেল ডায়েরি) দাখিল করা হয়েছে, তবে তদন্তে এখনো কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। পুলিশ এখনও নকল বইয়ের উৎপাদন ও বিক্রয় চেইন শনাক্ত করতে পারছে না, ফলে নকলের পরিধি বাড়তেই থাকে।
বাংলাদেশের কপিরাইট আইন অনুযায়ী বইয়ের অননুমোদিত কপি তৈরি ও বিক্রি অপরাধ, যার জন্য শাস্তি নির্ধারিত আছে। তবে বাস্তবে আইনি প্রয়োগে ঘাটতি ও প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা নকলকারীদের জন্য রক্ষা প্রদান করে। প্রকাশক ও লেখকরা আইনি সহায়তা চাওয়া সত্ত্বেও যথাযথ পদক্ষেপে পৌঁছাতে পারছেন না।
প্রকাশনা জগতের প্রতিনিধিরা পাঠকদের আহ্বান জানিয়েছেন, সস্তা দামের নকল বইয়ের পরিবর্তে আসল সংস্করণ কেনার মাধ্যমে লেখক ও প্রকাশকের পরিশ্রমকে সম্মান জানাতে। নকলের বিস্তার সাহিত্যিক শিল্পের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি, এবং এর ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি ভবিষ্যতে নতুন বইয়ের প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, নকল বইয়ের বিক্রয় বন্ধ করতে আইনি কাঠামোর শক্তিশালীকরণ ও সামাজিক মাধ্যমের পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি। নকলের শিকার হওয়া প্রকাশক ও লেখকরা ইতিমধ্যে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন।



