বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ, যার মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যা এখন ৮ কোটি ৩০ লাখের একটু বেশি। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষই ডিজিটাল জগতে সংযুক্ত। বাকি প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এখনও অনলাইন সেবার বাইরে।
ইন্টারনেটের প্রবেশে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য স্পষ্ট। পুরুষের মধ্যে ৫১ শতাংশই নিয়মিতভাবে নেট ব্যবহার করে, যেখানে নারীর অংশ মাত্র ৪৬ শতাংশের একটু বেশি। এই পার্থক্য শুধুমাত্র সংখ্যা নয়, বরং নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর মধ্যে একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায়। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের হার কম, এবং কম আয়ের পরিবারগুলোতে স্মার্টফোনের মালিকানা ও ডেটা প্যাকেজের খরচ বড় বাধা।
মোবাইল ডেটার উচ্চমূল্য, স্মার্টফোনের সীমিত প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি এই জনগোষ্ঠীকে অনলাইন থেকে দূরে রাখছে। ডেটা প্যাকেজের দাম অনেকের জন্য মাসিক আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে, ফলে নেট ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হার ৩৮.৯ শতাংশ ছিল। তিন বছর পর, ২০২৫ সালে এই হার ৪৮.৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রায় দশ শতাংশ পয়েন্টের বৃদ্ধি। সংখ্যা বাড়লেও, প্রবেশের সমতা এখনও দূরে।
এই অগ্রগতির পিছনে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ আছে। তারা উল্লেখ করে যে, শুধুমাত্র সংযোগের সংখ্যা বাড়ানো নয়, সবার জন্য সাশ্রয়ী ডেটা প্ল্যান, সুলভ স্মার্টফোন এবং মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ডিজিটাল সেবা, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স এবং সরকারি সেবা এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। তাই সংযোগহীন মানুষগুলো তথ্যের অভাব, চাকরির সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে বঞ্চিত থাকে।
বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে, ইন্টারনেটের অভাব তাদের পেশাগত উন্নয়ন, আর্থিক স্বাবলম্বিতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়লে নারী উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।
গ্রামীণ ও নগর এলাকার মধ্যে ডেটা খরচের পার্থক্য, নেটওয়ার্ক কভারেজের অসমতা এবং ডিভাইসের প্রাপ্যতা এই বৈষম্যকে বাড়িয়ে দেয়। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে সাশ্রয়ী ডেটা প্যাকেজ, কম দামের স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে যদি এই বাধাগুলো দূর করা যায়, তবে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারী সংখ্যা দ্রুত বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তাৎক্ষণিকভাবে নেট সংযোগের সুযোগ বাড়িয়ে, ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং ডেটা মূল্যের নিয়ন্ত্রণে নীতি গঠন করে সমতা অর্জন করা সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, যদিও গত তিন বছরে ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, তবু অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনও অফলাইন। লিঙ্গ, আয় এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য অব্যাহত, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার জন্য সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, সুলভ ডেটা এবং ব্যাপক ডিজিটাল শিক্ষা অপরিহার্য।



