ব্রিটেনের প্রায় ৩ লক্ষ ইহুদি নাগরিকের জীবনে গত দুই বছরকে সর্বাধিক পরিবর্তনশীল সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা অঞ্চলের ধ্বংস এবং সাম্প্রতিক হানুকা ও ইয়োম কিপুরের সময় সংঘটিত হিংসাত্মক ঘটনার ফলে ইহুদি পরিচয়ের উপর চাপ বাড়ছে।
ব্রিটিশ ইহুদি সংস্থার প্রধান ফিল রোজেনবার্গের মতে, এই সময়কালে ইহুদি পরিচয়কে অতিরিক্তভাবে প্রকাশ করতে হয়েছে, যা মানসিক ও সামাজিকভাবে চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ৭ অক্টোবরের হামলায় ব্রিটিশ নাগরিক ইহুদি কয়েকজন নিহত হয়েছেন এবং কিছু ব্রিটিশ সংযোগযুক্ত ব্যক্তি বন্ধকী হয়েছেন, ফলে সংঘাতের প্রভাব সরাসরি যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়কে স্পর্শ করেছে।
এরপর গাজা অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ দেখার কষ্ট, এবং সংঘাতের চারপাশে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণামূলক মন্তব্যগুলোও ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসকে ক্ষুণ্ণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বন্ডি বিচে হানুকা উদযাপনের সময় ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং ম্যানচেস্টার সাইনাগগে ইয়োম কিপুরের পবিত্র দিনে আক্রমণ ঘটেছে, যা যুক্তরাজ্যের ইহুদি নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ব্রিটিশ ইহুদি সমাজে এমন কোনো তীব্র পরিবর্তন দেখা যায়নি, যা দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। নিরাপত্তা অনুভূতি, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ এবং ইসরায়েল সম্পর্কিত আলোচনায় প্রজন্মগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
লন্ডনে বসবাসকারী ৩৩ বছর বয়সী বেং ডোরি জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাকে ইহুদি বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে এবং সম্প্রদায়ের কার্যক্রমে সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, এখন তিনি নিজের সাইনাগগে বেশি ভূমিকা পালন করছেন এবং অ্যান্টি-সেমিটিজমের বিরুদ্ধে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, যা তার নিরাপত্তা অনুভূতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে।
ব্রিটিশ ইহুদি সংস্থার নেতৃত্বের মতে, এই সময়কালে ইহুদি নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে, ইসরায়েল সংক্রান্ত মতামতে প্রজন্মগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; তরুণ ইহুদিরা ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভিন্নভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করছেন।
ইহুদি সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা বাড়াতে সাইনাগগ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। এছাড়া, অ্যান্টি-সেমিটিজমের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যা সম্প্রদায়ের আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনে সহায়তা করছে।
ব্রিটেনের সরকারও এই পরিস্থিতি স্বীকার করে, নিরাপত্তা সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে হিংসা প্রতিরোধে নীতি নির্ধারণে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তা নিয়ে বিশ্লেষকরা সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছেন।
সারসংক্ষেপে, গত দুই বছর ব্রিটিশ ইহুদি সমাজে গভীর পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা সংঘাত, বন্ডি বিচ ও ম্যানচেস্টার সাইনাগগে ঘটিত হিংসা, এবং ইসরায়েল সংক্রান্ত মতবিরোধ একত্রে নিরাপত্তা, পরিচয় ও সম্প্রদায়ের সংযোগে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে সরকার, নিরাপত্তা সংস্থা এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার উপর।



