২০২২ সালের শীতের এক সকালে, হংকংয়ের স্ট্যানলি কারাগারে মিডিয়া টায়ারনট জিমি লেইকে র্যাপেল ওয়ং এবং ফিগো চ্যান সাক্ষাৎ করলেন। দুজনই ২০১৯ সালের প্রতিবাদে সক্রিয় ছিলেন এবং লেইয়ের গ্রেফতারের দুই বছর পর তার সঙ্গে দেখা করার জন্য কারাগারে গিয়েছিলেন। লেই, যিনি অ্যাপল ডেইলির প্রতিষ্ঠাতা, তখন জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে বিচারাধীন ছিলেন।
র্যাপেল ওয়ং ও ফিগো চ্যান ২০১৯ সালের বিশাল প্রতিবাদে অংশগ্রহণের সময় লেইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময় তারা প্রায়ই ডিম সাম, পিজা বা ক্লে পট ভাতের মতো খাবার ভাগ করে খেতেন এবং পারস্পরিক মতবিনিময় করতেন। লেইয়ের প্রিয় খাবার ছিল আদা ভাজা ভাত, যা চ্যানের মতে কারাগারে তার অপ্রত্যাশিত পছন্দের মধ্যে একটি।
লেই ৭০-এর দশকে প্রবেশ করলেও, তার শারীরিক অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; পূর্বে ‘ফ্যাটি লেই’ নামে পরিচিত তিনি এখন ওজন কমে গেছেন। তার দুই সহকর্মী প্রায় ৪০ বছর কম বয়সী, তবু তারা এখনও হংকংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে একসাথে স্বপ্ন দেখেন।
প্রতিবাদে লেইয়ের ভূমিকা ছিল মিডিয়া শক্তি ব্যবহার করে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আহ্বান জানানো। তার প্রকাশিত সংবাদপত্র, অ্যাপল ডেইলি, হংকংয়ের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে তীব্র সমালোচনা করত। তবে ২০২০ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক আরোপিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ফলে তার প্রকাশনা ও কার্যক্রম কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
লেই যুক্তরাজ্যের নাগরিক হলেও, তিনি হংকং ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। গ্রেফতারের আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে হংকংকে তার সবকিছুর উৎস বলে উল্লেখ করেন এবং শহরের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে ইচ্ছুকতা প্রকাশ করেন। তার এই বক্তব্যের মধ্যে শহরের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ স্পষ্ট ছিল।
জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে লেইকে ‘সাবেক গৃহস্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তিনি এখন পর্যন্ত কোনো শর্তে মুক্তি পাননি। তার গ্রেফতার ও বিচারের ফলে হংকংয়ের প্রেস স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে।
লেইয়ের বন্ধুরা জানান, তিনি কারাগারে থাকা সত্ত্বেও হংকংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন এবং তার স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। তার স্বাস্থ্য অবস্থা ও ওজন হ্রাসের পরেও তিনি রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
হংকংয়ের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে লেইয়ের মতো উচ্চপ্রোফাইল মিডিয়া ব্যক্তিত্বের গ্রেফতার একটি শক্তিশালী সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে চীনের কেন্দ্রীয় সরকার হংকংয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, লেইয়ের দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস হংকংয়ের গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করবে এবং স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের সংকট তৈরি করবে। একই সঙ্গে, এটি প্রো-ডেমোক্রেসি আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের জন্য ভয় ও আত্মসংযমের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, হংকংয়ের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী লেইয়ের অবস্থানকে স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আহ্বান করছে। তারা আশা করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ চীনের নীতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতে লেইয়ের মামলা কীভাবে সমাপ্ত হবে তা অনিশ্চিত, তবে তার বিচার প্রক্রিয়া হংকংয়ের আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। তার রায়ের ফলাফল হংকংয়ের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, র্যাপেল ওয়ং ও ফিগো চ্যানের লেইয়ের সঙ্গে পুনর্মিলন হংকংয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা যায়। লেইয়ের গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া হংকংয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ, মিডিয়া স্বাধীনতা এবং চীনের নীতি প্রয়োগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।



