জাতিসংঘের শান্তি রক্ষার উদ্যোগে বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালে প্রথম পদক্ষেপ নেয়, তখনই ইরান‑ইরাক সীমান্তে পর্যবেক্ষক মিশনে মাত্র পনেরো জন সেনা পাঠায়। এর পর থেকে দেশের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ ইউনিটগুলো বিশ্বব্যাপী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিয়মিতভাবে কাজ করে আসছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের শান্তি রক্ষার কার্যক্রম ১৯৪৮ সালে শুরু হলেও বাংলাদেশ ৪০ বছর পরে এই মঞ্চে প্রবেশ করে। প্রথম মিশন থেকে আজ পর্যন্ত দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ১১৯টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ সৈন্যসংখ্যা পাঠিয়ে শীর্ষস্থান বজায় রেখেছে। বর্তমানে বাংলাদেশি নীল হেলমেট পরিহিত শান্তিরক্ষীরা দশটি ভিন্ন দেশে সক্রিয়, যেখানে তারা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কাজের দায়িত্বে রয়েছে।
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা ভয়াবহ রূপ নেয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হালকা অস্ত্র নিয়ে উপস্থিত হয়ে বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করে বড় পরিসরের হত্যাকাণ্ড রোধ করে। একই সময়ে কঙ্গো, সুদান, মালি ও দক্ষিণ সুদানে তারা স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক ও কৃষি প্রকল্পের নির্মাণে সরাসরি অংশগ্রহণ করে, যা স্থানীয় জনগণের জীবনের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের মানবিক কাজের স্বীকৃতি সিয়েরা লিওনের সরকারও প্রকাশ করেছে; তারা দেশের শান্তিরক্ষীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলা ভাষাকে তাদের অন্যতম সম্মানিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই স্বীকৃতি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মঞ্চে একটি অনন্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলা ভাষার উপস্থিতি বাড়িয়ে দেয়।
২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রথম মুসলিম-সংখ্যাতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ইউনাইটেড নেশনসের শান্তি রক্ষায় নারী পুলিশ ইউনিট পাঠায়। এর পর থেকে ১,৭১৮ জনের বেশি নারী শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে অংশগ্রহণ করেছে, যা জাতিসংঘের নারী শান্তিরক্ষীর অংশীদারিত্ব ২২% লক্ষ্যের দিকে বাংলাদেশকে ১৮‑১৯% পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এই অগ্রগতি দেশের লিঙ্গ সমতা নীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নারীর ভূমিকা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের ধারাবাহিকভাবে বৃহৎ মাপের শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ তার কূটনৈতিক প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলেছে এবং দেশের সফট পাওয়ারকে শক্তিশালী করেছে।” এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শান্তি রক্ষার মাধ্যমে দেশটি কেবল নিরাপত্তা ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। মিশনগুলোতে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ দেশীয় সামরিক ও পুলিশ সংস্থার পেশাদারিত্ব বাড়িয়ে তুলেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষার কাঠামো পুনর্গঠন ও মিশনের গুণগত মান উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে। বাংলাদেশি নেতারা এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে ইচ্ছুক, বিশেষ করে নারী শান্তিরক্ষীর অংশীদারিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করতে। আগামী কয়েক বছরে দেশের লক্ষ্য ২২% নারী অংশগ্রহণের সমানুপাতিকতা অর্জন এবং নতুন মিশনে উচ্চতর নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করা।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাদের কাজ কেবল যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে না, বরং পুনর্গঠন, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা গড়ে তুলছে। এই ধারাবাহিকতা দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়িয়ে তুলছে এবং ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ কূটনৈতিক সুযোগের দরজা খুলে দেবে।



