বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রথম দশকের শুরুতে ‘সৌর জগত’ নামের একটি ছোট গল্প লিখেছিলেন। এই গল্পে গৌহর নামের একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তার নয় কন্যাকে কুরসিয়ং-এর ডাউ হিল স্কুলে পাঠাতে চান। তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন, কারণ তারা ভয় পান যে কনভেন্ট শিক্ষা তাদের মেয়েদেরকে খ্রিস্টান বানিয়ে দেবে। কিন্তু গৌহর এবং তার স্ত্রী আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তাদের মেয়েরা ইসলামিক মূল্যবোধ এবং ধর্মগ্রন্থের সাথে পরিচিত হওয়ায় তারা কখনই খ্রিস্টান হবে না।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৯১১ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম মুসলিম মেয়েদের স্কুল। স্কুলটি শুরু হয়েছিল মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে। বেগম রোকেয়ার মৃত্যুর আগে, ১৯৩২ সালে, স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১৪৯ জন।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলোতে তার স্কুলে মেয়েদের ভর্তির জন্য প্রচার করেছিলেন। তিনি পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তার স্কুলে পুরদাহ নিয়ম মেনে চলা হবে। স্কুলের বাসগুলোতে পর্দা থাকত, যা অমুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা ‘চলমান কালো গর্ত’ বলে অভিহিত করত।
বেগম রোকেয়ার এই উদ্যোগ মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। তিনি তার সময়ের সামাজিক নিয়ম এবং মূল্যবোধের মধ্যে থেকেও মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করেছিলেন।
বেগম রোকেয়ার এই প্রচেষ্টার ফলে মুসলিম সমাজে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছিল। তার স্কুল মুসলিম মেয়েদের জন্য একটি আদর্শ হয়ে উঠেছিল। বেগম রোকেয়ার এই অবদান আজও স্মরণ করা হয় এবং তার নাম মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি যে সামাজিক পরিবর্তন সাধন করতে হলে আমাদের নিজেদেরকে প্রথমে পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের নিজেদের মধ্যে থাকা পুরানো মনোভাব ও কুসংস্কারগুলোকে দূর করে আমাদের নিজেদেরকে নতুন চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা সামাজিক পরিবর্তন সাধন করতে পারব এবং একটি উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম থেকে আমরা আরও শিক্ষা নিতে পারি যে শিক্ষা হল সামাজিক পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষা ছাড়া আমরা সামাজিক পরিবর্তন সাধন করতে পারি না। তাই আমাদের শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং শিক্ষা গ্রহণের জন্য সকলকে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে পারব।



