পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা পঞ্চগড় চিনিকলের দিকে এগিয়ে যায়। তাদের সাথে ১২টি ট্যাংকও ছিল। চিনিকল এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের শক্ত ঘাঁটি ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে যায় এবং পঞ্চগড় মুক্ত হয়।
বিজয়ের আনন্দে সবাই উল্লসিত হলেও, এক বিষাদের ঘটনা ঘটে। চিনিকল এলাকার গ্যারেজের সামনে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখে তরুণ যোদ্ধা হারুন অর রশীদ এগিয়ে যান। স্টেনগান কাঁধে নিয়ে দৌড়ে যান পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে। সেই সময় পাশের একটি বাংকারে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা পাকিস্তানি সেনা গুলি করতে থাকেন। হারুনের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। বিজয়ের মুহূর্তে এমন ঘটনায় মর্মাহত হয়ে পড়েন তার সহযোদ্ধারা।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নাজমুল হকের লেখা ‘পঞ্চগড় জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চগড়ের মধুপাড়া কোম্পানি কমান্ডার মাহবুব আলমের লেখা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ বইয়ে সেই দিনের কথা আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে ও ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত পঞ্চগড় মুক্ত ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী সড়কপথে পঞ্চগড়ের দিকে এগোতে থাকে। ১৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা পঞ্চগড় দখল করে নেয়। যুদ্ধে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছিয়ে যান। আশ্রয় নেন মাগুরমারীতে। তাঁরা অমরখানা এলাকার চাওয়াই নদের সেতু ডিনামাইট দিয়ে ভেঙে দেন। ফলে পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড়ের সর্ব-উত্তরের এলাকা তেঁতুলিয়ায় ঢুকতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়কাল তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চগড় ছিল ৬ (ক) সেক্টরের আওতাধীন। এ অঞ্চলে মোট ৭টি কোম্পানির অধীন ৪০টি মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। জুলাই মাস থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ বাড়তে থাকে। নভেম্বর মাসের শুরু থেকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর একের পর এক ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে সফল হতে থাকে। সেই সব দিনের কথা স্মরণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাসের যুদ্ধের পর পঞ্চগড় মুক্ত হয়। এই মুক্তিযুদ্ধে অনেক ত্যাগী শহিদ হন। তাদের ত্যাগ আমাদের মুক্তিকে স্থায়ী করেছে।
পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ইতিহাস আমাদেরকে আমাদের মুক্তির মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের এই ইতিহাসকে সম্মান করে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে এই ইতিহাস শিক্ষা দেয়া আমাদের দায়িত্ব।



