২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার, সকাল সাড়ে দশটায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টার্মিনাল সংক্রান্ত একটি বৈঠক পরিচালনা করেন। বৈঠকের পর বাণিজ্যিক ও শিল্প উন্নয়ন অধিদপ্তরের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উল্লেখ করেন যে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জন্য দেশি‑বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এই অবস্থান পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে চুক্তি শুধুমাত্র তখনই হবে যখন তা বাস্তবিকভাবে সম্ভব হবে।
আশিক চৌধুরী আরও জানান, বর্তমান সরকারও পূর্বের মতই রূপরেখা অনুসরণ করবে; অর্থাৎ, টার্মিনালের পরিচালনা ও মালিকানার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামো বজায় থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এবং কোনো চুক্তি স্বল্পমেয়াদে না হয়ে দীর্ঘমেয়াদে উপকারি হলে তা বিবেচনা করা হবে। এই বিবৃতি সরকারী নীতি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে, তবে নির্দিষ্ট কোনো পার্টনারের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের জন্য সরকারি‑বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিক সমঝোতা স্মারক ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। ঐ স্মারক অনুসারে, টার্মিনালের উন্নয়ন ও পরিচালনা দু’পক্ষের যৌথ উদ্যোগে সম্পন্ন হবে বলে ধার্য করা হয়েছিল। তবে, এরপর থেকে চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন আইনি ও নীতিগত বাধা দেখা দেয়, যা এখনো সম্পূর্ণভাবে সমাধান হয়নি।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়; এই পদক্ষেপটি অন্তর্বর্তী সরকারও ত্বরান্বিত করে। তবে, হাইকোর্টের রায়ে এই হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে রিট দেওয়া হয়েছে, ফলে চূড়ান্ত হস্তান্তর এখনো রোধে রয়েছে। আদালতের রিটের ফলে টার্মিনালের মালিকানা ও পরিচালনা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে, যা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
নিউমুরিং টার্মিনাল ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নির্মিত হয় এবং মোট ২,৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি সংযোজনসহ সম্পূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। এই বৃহৎ বিনিয়োগ দেশের বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজতর করার লক্ষ্যে করা হয়েছিল। টার্মিনালের নির্মাণ ও সরঞ্জাম ক্রয় উভয়ই সরকারী তহবিলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যা দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমানে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড টার্মিনালের দৈনন্দিন কার্যক্রম, রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করে আসছে। এই পরিচালনাকারী সংস্থা টার্মিনালের কার্যকরী দক্ষতা বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান করতে সক্ষম বলে সরকারী সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে হস্তান্তরের পূর্বে, চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা অব্যাহত থাকবে বলে আশিক চৌধুরী স্পষ্ট করেন। এই ধারাবাহিকতা টার্মিনালের কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়ে বাণিজ্যিক প্রবাহ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, সরকার এই সময়কালে সম্ভাব্য পার্টনারশিপের শর্তাবলী ও শর্তাদি পর্যালোচনা করে, দেশের স্বার্থে সর্বোত্তম সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
চুক্তি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বাণিজ্যিক বাজারে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করেছে; সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি এখনো চূড়ান্ত শর্তাবলী সম্পর্কে স্পষ্টতা পায়নি। এই অনিশ্চয়তা টার্মিনালের আয় ও রাজস্ব পূর্বাভাসে প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে বন্দর সংক্রান্ত আর্থিক পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা দরকার হতে পারে। সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট যে, কোনো চুক্তি স্বল্পমেয়াদে না হয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হতে হবে। ভবিষ্যতে, যদি চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তা দেশের বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে, তবে বর্তমান অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।



