একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে নেট-ধরা মাকড়সা (Deinopidae) শিকারের ধরনকে সহজে সম্পন্ন করতে বিশেষ গঠনযুক্ত সিল্ক ব্যবহার করে। গবেষকরা উচ্চ গতির ক্যামেরা এবং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে এই সিল্কের গঠন ও কাজের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেছেন। ফলাফল দেখায় যে সিল্কের জটিল স্তর শিকারের ধরা ও ধরা-পরের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নেট-ধরা মাকড়সা হল এমন এক প্রজাতি যা শিকারের জন্য ত্রিভুজাকার বা আয়তাকার নেট গড়ে ফেলে এবং তা বাতাসে ছুঁড়ে দেয়। এই মাকড়সাগুলো সাধারণত গাছের শাখা বা পাতা নিচে বসে থাকে এবং শিকারের নড়াচড়া অনুভব করে দ্রুত নেটকে শিকারের দিকে নিক্ষেপ করে। নেটের আকার ও টান সামঞ্জস্য করতে তারা পা দিয়ে নেটকে টেনে নেয়।
এই গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগে পরিচালিত হয়। দলটি বিভিন্ন প্রজাতির নেট-ধরা মাকড়সা সংগ্রহ করে ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তাদের নেট গঠন পর্যবেক্ষণ করে। সিল্কের সূক্ষ্ম গঠন বিশ্লেষণের জন্য স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ এবং পারদর্শী রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কপি ব্যবহার করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায় যে নেটের সিল্ক একক স্তরের নয়, বরং দুইটি ভিন্ন ঘনত্বের স্তর নিয়ে গঠিত। বাইরের স্তরটি তুলনামূলকভাবে কঠিন এবং শিকারের আঘাত শোষণ করে, আর ভিতরের স্তরটি নরম ও ইলাস্টিক, যা নেটকে দ্রুত প্রসারিত করতে সাহায্য করে। এই দ্বি-স্তরীয় গঠন নেটকে শক্তি হারানো ছাড়াই বড় আকারে বিস্তৃত করতে সক্ষম করে।
সিল্কের প্রোটিন বিশ্লেষণে নির্ধারিত হয়েছে যে এতে দুটি প্রধান প্রোটিন ফ্যামিলি রয়েছে, যাদের নাম স্পাইডার ফাইব্রিন এবং গ্লাইকোপ্রোটিন। স্পাইডার ফাইব্রিন নেটকে টেকসইতা প্রদান করে, আর গ্লাইকোপ্রোটিন নেটের আর্দ্রতা শোষণ করে তার লচিলতা বাড়ায়। এই দু’টি উপাদানের অনুপাত নেটের ধরণের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
যান্ত্রিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে নেটের টান শক্তি সাধারণ শিকারের সিল্কের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, তবে তার ইলাস্টিসিটি একই সময়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। ফলে নেট দ্রুত প্রসারিত হয়ে শিকারের চারপাশে ঘূর্ণায়মান গতিতে বিস্তৃত হতে পারে, এবং শিকারের আঘাতের পরেও নেটের গঠন ভাঙে না।
মাকড়সা নেটকে ধরার সময় প্রথমে তার সামনের পা দিয়ে নেটকে টেনে নেয় এবং তারপর পেছনের পা দিয়ে নেটকে সোজা করে। শিকারের নড়াচড়া অনুভব হলে, মাকড়সা দ্রুত নেটকে শিকারের দিকে ছুঁড়ে দেয়, যা এক সেকেন্ডের কম সময়ে শিকারের উপর লেগে যায়। নেটের আঠালো পৃষ্ঠ শিকারের পা ও দেহকে দৃঢ়ভাবে আটকায়।
শিকারের ধরা হওয়ার পর মাকড়সা নেটের দিকে দ্রুত এগিয়ে এসে শিকারের দেহকে কামড় দিয়ে বিষ প্রবেশ করায়। নেটের দ্বি-স্তরীয় গঠন শিকারের দেহকে স্লিপেজ না করতে সাহায্য করে, ফলে মাকড়সা সহজে শিকারের শ্বাস বন্ধ করতে পারে। ধরা-পরের সময় নেটটি পুনরায় ব্যবহার করা যায়, কারণ সিল্কের টেকসইতা উচ্চ।
এই ধরণের শিকারের কৌশল মাকড়সার বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে যেখানে শিকারের প্রাপ্যতা সীমিত। নেট-ধরা মাকড়সা ছোট পোকামাকড়, গ্লাইডার এবং কখনও কখনও ছোট পাখির বাচ্চা ধরতে সক্ষম। নেটের উচ্চ কার্যকারিতা তাদের শিকারের পরিসর বাড়িয়ে দেয় এবং শিকারের ঘনত্ব কমে গেলে বেঁচে থাকা সহজ করে।
অন্যান্য স্পাইডার সিল্কের তুলনায় নেট-ধরা মাকড়সার সিল্কের গঠন ও বৈশিষ্ট্য আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, জাল-ধরা মাকড়সার সিল্ক প্রধানত টেনশন ও স্টিকি পয়েন্টে নির্ভর করে, যেখানে নেট-ধরা মাকড়সা নেটের বিস্তৃতি ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্যতার জন্য ইলাস্টিক ও শক্তিশালী স্তর দরকার। এই পার্থক্য সিল্কের জিনগত নিয়ন্ত্রণে ভিন্নতা নির্দেশ করে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় নেট-ধরা মাকড়সার সিল্ককে বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে দেখছে। উচ্চ টান শক্তি ও ইলাস্টিসিটি একসাথে থাকা এই সিল্কের গঠন, হালকা ও টেকসই উপকরণ তৈরিতে অনুপ্রেরণা দিতে পারে। ভবিষ্যতে এই প্রাকৃতিক নকশা থেকে অনুকরণ করে চিকিৎসা, রোবোটিক্স বা পরিবেশগত সেন্সর তৈরির গবেষণা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, নেট-ধরা মাকড়সার জটিল সিল্কের গঠন শিকারের ধরার দক্ষতা বাড়ায় এবং প্রাকৃতিক জগতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করে। এই আবিষ্কার আমাদেরকে স্পাইডার সিল্কের বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। আপনি কি মনে করেন, এই প্রাকৃতিক নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভবিষ্যতে কোন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্ভব হবে?



