একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, চুলকানি সৃষ্টিকারী একটি প্রোটিন একই সঙ্গে স্ক্র্যাচিং থামানোর সংকেতও পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা মাউসের ত্বকে এই প্রোটিনের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল প্রকাশ করেছেন। গবেষণাটি ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ তারিখে একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয় এবং চুলকানি নিয়ন্ত্রণে নতুন থেরাপির সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
প্রোটিনটি ‘মার্গপ্রা‑এ৩’ (MrgprA3) নামে পরিচিত, যা ত্বকের সংবেদনশীল স্নায়ু কোষে উপস্থিত থাকে। পূর্বে জানা যায়, এই প্রোটিন সক্রিয় হলে ত্বকে চুলকানি অনুভূতি উদ্ভব হয় এবং মানুষ স্বাভাবিকভাবে স্ক্র্যাচ করতে চায়। গবেষকরা জেনেটিক টেকনিক ব্যবহার করে মাউসের মার্গপ্রা‑এ৩ প্রোটিনকে চিহ্নিত করে দেখেছেন যে, প্রোটিনের সক্রিয়করণ শুধু চুলকানি সৃষ্টিই নয়, তাছাড়া স্পাইনাল কর্ডের নির্দিষ্ট ইনহিবিটরি নিউরনকে সক্রিয় করে স্ক্র্যাচিং আচরণকে দমন করে।
এই ফলাফল নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা অপটোজেনেটিক্স এবং ক্যালসিয়াম ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। মাউসের ত্বকে মার্গপ্রা‑এ৩ প্রোটিনকে আলোর মাধ্যমে সক্রিয় করা হলে প্রথমে ত্বকে তীব্র চুলকানি সংকেত পাঠায়, তবে একই সঙ্গে স্পাইনাল কর্ডের গামা‑অ্যামিনোবিউটিরিক অ্যাসিড (GABA) নির্গত করে এমন নিউরন সক্রিয় হয়। এই ইনহিবিটরি সিগন্যাল দ্রুত স্ক্র্যাচিং চালনা করা মোটর নিউরনকে দমন করে, ফলে মাউসের স্ক্র্যাচিং সময় স্বল্প হয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, যখন মার্গপ্রা‑এ৩ প্রোটিনের সক্রিয়করণকে ব্লক করা হয়, তখন মাউসের চুলকানি তীব্র হয় এবং স্ক্র্যাচিং সময় বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, ইনহিবিটরি নিউরনকে অতিরিক্ত উদ্দীপিত করলে স্ক্র্যাচিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যদিও চুলকানি অনুভূতি এখনও থাকে। এই দ্বৈত প্রভাব নির্দেশ করে যে চুলকানি এবং স্ক্র্যাচিং দুটি পৃথক সিগন্যাল পথের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, যদিও উভয়ই একই প্রোটিনের মাধ্যমে শুরু হয়।
বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন, এই আবিষ্কার চুলকানি রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নতুন ওষুধের বিকাশে সহায়ক হতে পারে। বর্তমান অ্যান্টি‑ইচ থেরাপি প্রধানত চুলকানি সৃষ্টির সিগন্যালকে দমন করার দিকে মনোযোগ দেয়, ফলে প্রায়ই স্ক্র্যাচিং বন্ধ হয় না এবং ত্বকে ক্ষতি হয়। মার্গপ্রা‑এ৩ প্রোটিনের ইনহিবিটরি সিগন্যালকে বাড়িয়ে দিলে স্ক্র্যাচিং স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে, যা ত্বকের ক্ষতি কমিয়ে রোগের অগ্রগতি ধীর করবে।
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ড. লিনা হোয়াটসন, যিনি বলেন, “চুলকানি এবং স্ক্র্যাচিংকে আলাদা সিগন্যাল হিসেবে বিবেচনা করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মার্গপ্রা‑এ৩ প্রোটিনের দ্বৈত ভূমিকা বুঝে আমরা ভবিষ্যতে আরও নির্দিষ্ট থেরাপি তৈরি করতে পারব।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই ফলাফলটি মাউস মডেলে প্রমাণিত হলেও, মানব ত্বকে একই প্রক্রিয়া কাজ করে কিনা তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ক্লিনিকাল গবেষণা প্রয়োজন।”
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, স্ক্র্যাচিং বন্ধের সিগন্যালটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুলকানি সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত থাকে, ফলে শরীরের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা ত্বকের ক্ষতি কমাতে কাজ করে। যদিও মানব দেহে এই প্রক্রিয়ার সূক্ষ্মতা এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি, তবু এই ফলাফলটি চুলকানি রোগের রোগবৈশিষ্ট্যকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেয়।
অবশেষে, গবেষকরা সুপারিশ করেন যে ভবিষ্যতে মার্গপ্রা‑এ৩ প্রোটিনের ইনহিবিটরি পথকে লক্ষ্য করে ওষুধ তৈরি করা উচিত, যাতে চুলকানি সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে স্ক্র্যাচিংও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এই পদ্ধতি ত্বকের ক্ষতি কমিয়ে রোগীর জীবনমান উন্নত করতে পারে। চুলকানি রোগে আক্রান্ত রোগীরা কি এই নতুন পদ্ধতি থেকে উপকৃত হতে পারবেন, তা জানার জন্য ক্লিনিকাল ট্রায়াল চালু হওয়ার অপেক্ষা বাকি।
চুলকানি ও স্ক্র্যাচিং নিয়ন্ত্রণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গবেষণাটি বিজ্ঞান জগতে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও উন্নয়নের দরজা খুলে দিয়েছে। আপনার ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এই ধরনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কীভাবে কাজে লাগবে, তা নিয়ে আপনার মতামত শেয়ার করুন।



