কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শহর ও গ্রামাঞ্চলে ধুলোবালির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে। গ্রীষ্মের গরম ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিহীন অবস্থার ফলে ধুলো বাতাসে মিশে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এই পরিস্থিতি শ্বাসযন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ধুলোবালির মূল উৎস হিসেবে কৃষিকাজের সময় মাটি কাটা, ট্র্যাক্টর দ্বারা পরিবহন, পাশাপাশি বাড়িঘর নির্মাণের কাজ উল্লেখ করা হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ধুলোকে বাতাসে দীর্ঘ সময় ধরে ভাসিয়ে রাখে, ফলে পুরো অঞ্চল ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। এই পরিবেশগত পরিবর্তন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
শ্বাসযন্ত্রের রোগের ক্ষেত্রে ধুলোবালি বিশেষভাবে ক্ষতিকর। সব বয়সের মানুষই সর্দি, কাশি, হাঁপানি এবং শ্বাসকষ্টের অভিযোগে হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছেন। ধুলোবালি শ্বাসের সঙ্গে সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে, যা শ্বাসযন্ত্রের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দেয় এবং রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি করে।
দীর্ঘমেয়াদে ধুলোবালি চর্মরোগ এবং কিডনি সমস্যার মতো জটিল রোগের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ত্বকে ধারাবাহিক ঘষা, চুলকানি এবং রুক্ষতা দেখা দিচ্ছে, আর কিডনি কার্যকারিতার ওপর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণায় সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জন্য সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জরুরি।
আল খিদমাহ স্পেশালাইজড ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদ বিন আনোয়ার উল্লেখ করেছেন যে, ধুলোবালি হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের অন্যতম প্রধান উদ্রেককারী। ধুলো শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে শ্বাসযন্ত্রের রক্তনালীর সংবেদনশীলতা বাড়ে, ফলে সর্দি-কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দ্রুত প্রকাশ পায়। অন্যান্য অ্যালার্জেনের তুলনায় ধুলো সহজে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে, যা রোগের তীব্রতা বাড়ায়।
ডা. সাইদের পরামর্শ অনুযায়ী, ধুলোবালি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য বাইরে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিশেষ করে শিশুরা, বয়স্ক ও শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এছাড়া, অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় বাইরে না থাকা, গাছপালা রোপণ করে ধুলো কমানো এবং ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখা সহ কিছু সহজ পদক্ষেপ স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা সম্প্রদায়কে ধুলোবালি সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য তথ্যবহুল পোস্টার ও সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল বাসিন্দাদের মধ্যে সঠিক শ্বাসযন্ত্রের যত্নের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো দ্রুত শনাক্ত করা।
ধুলোবালি সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে শস্যের ফসল কাটার সময় মাটি ধুলো কমাতে সেচ ব্যবস্থা ও সঠিক সময়ে ফসল সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, নির্মাণ কাজের সময় ধুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি ছিটিয়ে কাজ করা এবং ট্র্যাক্টর চালানোর সময় ধুলো কমাতে স্প্রেডার ব্যবহার করা উচিত।
সামগ্রিকভাবে, লাকসামের ধুলোবালি বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে শ্বাসযন্ত্রের রোগ বাড়িয়ে তুললেও, সঠিক রক্ষা ব্যবস্থা ও সচেতনতা দিয়ে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাসিন্দাদের জন্য প্রশ্ন রয়ে যায়: আপনি কি আপনার দৈনন্দিন রুটিনে ধুলোবালি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন? আপনার উত্তরই ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যের সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি হতে পারে।



