আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে টিমের অভ্যন্তরে ‘রাজসাক্ষী’ (অ্যাপ্রুভার) নির্ধারণ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। টিমের সদস্য বি এম সুলতান মাহমুদ তাজুল ইসলাম এবং গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিমের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অভিযুক্তদের রাজসাক্ষী করে মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। উভয় অভিযুক্তই এই দাবিগুলোকে অস্বীকার করে, এ ধরনের প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার স্বীকৃত আইনি পদ্ধতি বলে উল্লেখ করেছেন।
সুলতান মাহমুদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তামিমের অফিসে নভেম্বরের শেষের দিকে এসআই আবজালুল হকের স্ত্রী একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করা। তিনি জানান, এই ঘটনার পর হককে রাজসাক্ষী করে মুক্তি দেওয়া হয়। তামিমের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্কের বিষয়ে সুলতান মাহমুদ তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটরকে জানিয়েও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া এবং তার বদলে তাকে তাড়া‑তাড়ি করা হয়েছে, এ কথা তিনি প্রকাশ করেছেন।
সুলতান মাহমুদ এই প্রক্রিয়াকে “তাজুল সিন্ডিকেট” নামে অভিহিত করে, যা তার মতে আর্থিক লাভের মাধ্যম। তিনি অতীতে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল‑মামুনকে রাজসাক্ষী করে মাত্র পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাছাড়া রংপুর ও চানখারপুলের নির্দিষ্ট মামলাগুলোর অভিযুক্তদের রেহাই দিয়ে রাজসাক্ষী করা হয়েছে, এ কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, ১৭ নভেম্বরের সিদ্ধান্তে সাবেক আইজিপি মামুনকে শেক হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও অপ্রত্যাশিত বলে খণ্ডন করেছেন। তিনি স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্সে অ্যাপ্রুভার নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সাফল্য এবং সব প্রক্রিয়া পদ্ধতিগতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তামিমের মতে, রাজসাক্ষী প্রস্তাব দেওয়া হয় যাতে অভিযুক্তের ভিতরের তথ্য সংগ্রহ করা যায়; অভিযোগের দিকটি উল্টোভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো প্রমাণ ছাড়া এই অভিযোগগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
প্রসিকিউশন টিমের আরেকজন সদস্য মিজানুল ইসলাম সুলতান মাহমুদের অভিযোগকে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ না থাকায়, এই দাবিগুলোকে অস্বীকার করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, রাজসাক্ষী প্রক্রিয়া আইনগতভাবে বৈধ এবং ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ নীতি অনুসারে পরিচালিত হয়।
এই বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ তদারকি কমিটি বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি বিশেষ দল গঠন করেছে। তদারকি কমিটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড পর্যালোচনা এবং প্রাসঙ্গিক নথিপত্রের বিশ্লেষণ করবে। তদন্তের ফলাফল যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো অনিয়ম ঘটেছে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, যদি অভিযোগ অপ্রমাণিত থাকে, তবে টিমের অভ্যন্তরে পুনরায় বিশ্বাস স্থাপনের জন্য প্রাসঙ্গিক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরে রাজসাক্ষী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রাজসাক্ষী ব্যবস্থা অপরাধীর দোষ স্বীকারের মাধ্যমে অপরাধের বিশদ তথ্য সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়, তবে এর অপব্যবহার হলে ন্যায়বিচারকে ক্ষুন্ন করতে পারে। তাই, ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ তদারকি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি।
বিষয়টি বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের উচ্চতর পর্যায়ে আলোচনার অধীন, এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য ও ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি রোধে নতুন নীতি বা নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হতে পারে।



