বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রকৌশলী রমানাথ পূজারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। তিনি মঙ্গলবারই দায়িত্ব গ্রহণের শপথ গ্রহণ করেন এবং কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্বে বসেন। এই পদবী পরিবর্তন কোম্পানির কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও ক্রস‑বর্ডার বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বিআইএফপিসিএল হল বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে গঠিত একটি শক্তি সংস্থা, যা উভয় দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে এবং পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়াতে লক্ষ্য রাখে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা পূর্বে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট (এমএসটিপিপি) নামে পরিচিত, এই যৌথ উদ্যোগের মূল সম্পদ। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিযুক্তি প্রকল্পের কার্যকরী পরিচালনা ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে।
রমানাথ পূজারি দায়িত্ব গ্রহণের আগে এমএসটিপিপির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি রামপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সুবিধার দৈনন্দিন পরিচালনা, তান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের অনুসরণে দায়িত্বশীল ছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে বিআইএফপিসিএলের শীর্ষ পর্যায়ে উপযুক্ত প্রার্থী করে তুলেছে।
এমএসটিপিপিতে তার নেতৃত্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্ভরযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিধি মেনে চলা এবং নির্গমন হ্রাসের জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। পাশাপাশি, প্রকল্পের আশেপাশের টাউনশিপ ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের স্বীকৃতি অর্জন করেন।
রমানাথ পূজারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা এনটিপিসি লিমিটেডে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করা। সেখানে তিনি প্ল্যান্টের পরিচালনা, নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশগত বিধি মেনে চলার তত্ত্বাবধান করেন। এই পদে তার কাজের ফলস্বরূপ এনটিপিসি-র বহু প্রকল্পে উৎপাদন দক্ষতা ও পরিবেশগত সম্মতি উন্নত হয়েছে।
১৯৬৮ সালে ওড়িশা, ভারতের একটি শহরে জন্মগ্রহণ করা রমানাথ পূজারি ১৯৮৯ সালে এনটিপিসি-তে যোগদান করেন। তার ক্যারিয়ার প্রায় তিন দশক জুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে ক্রস‑বর্ডার বিদ্যুৎ প্রকল্পের জটিলতা মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলেছে।
বিআইএফপিসিএলের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তার দায়িত্বের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দুই দেশের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের সংযোগ সুদৃঢ় করা অন্তর্ভুক্ত। রামপাল প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমিয়ে শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে, ভারতীয় বাজারে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রমানাথ পূজারির নেতৃত্বে প্রকল্পের সময়সূচি মেনে চলা এবং খরচ নিয়ন্ত্রণে উন্নতি হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে। বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি মূলধন প্রবেশের জন্য স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। তাই নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এই দিকগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
অন্যদিকে, প্রকল্পের পরিবেশগত দায়িত্ব এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করা ঝুঁকি হ্রাসের মূল বিষয়। পূর্বে পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলার সফল রেকর্ড থাকা পূজারি, এই দিকটিতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেবেন বলে আশা করা যায়। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি সংযোজনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হতে পারে।
বিআইএফপিসিএলের আর্থিক পরিকল্পনা অনুযায়ী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি, যা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এই ক্ষমতা পূর্ণভাবে ব্যবহার করে উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বিক্রয় থেকে আয় বৃদ্ধি পাবে এবং ঋণ পরিশোধের গতি ত্বরান্বিত হবে।
কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রমানাথ পূজারির নিয়োগে শেয়ার মূল্যের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ লভ্যাংশের সম্ভাবনা বাড়বে। ক্রস‑বর্ডার বিদ্যুৎ লেনদেনে রেজার্ভ ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ প্রবণতা হিসেবে রামপাল প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া বিদ্যুৎ বাণিজ্যের পরিসর বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন। রমানাথ পূজারির অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বে প্রকল্পের সময়সূচি মেনে চলা এবং উৎপাদন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। ফলে উভয় দেশের শক্তি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সারসংক্ষেপে, রমানাথ পূজারির নতুন দায়িত্ব গ্রহণ বিআইএফপিসিএলের কৌশলগত লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করবে এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্ষমতা বাড়াবে বলে আশা করা যায়। তার পূর্বের সফল প্রকল্প পরিচালনা ও পরিবেশগত মানদণ্ডের প্রতি অঙ্গীকারকে ভিত্তি করে কোম্পানি ভবিষ্যতে শক্তি উৎপাদন ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে। এই পরিবর্তন দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে এবং আঞ্চলিক শক্তি সহযোগিতার মডেল গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।



