বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার মানবসম্পদ বিভাগ থেকে শোকজ নোটিশ জারি করে তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে, যাঁরা গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরের স্বৈরাচার মন্তব্যের পর প্রকাশ্যভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। নোটিশের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কর্মীদের মানসিক সমর্থন নিশ্চিত করা।
শোকজ নোটিশে উল্লেখিত তিনজন কর্মকর্তা হলেন নওশাদ মোস্তফা, যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক এবং এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক; একেএম মাসুম বিল্লাহ, অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি; এবং গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ, একই কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক। এ সকল পদবী ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিকালেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেন যে শোকজ নোটিশটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ এবং কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সূচক নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে এই ধরনের নোটিশ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সংস্থার দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
এই ঘটনার পটভূমিতে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নেয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং নীতিমালার স্বায়ত্তশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তীব্রতর হয়েছে।
ব্রেকিং নিউজ অনুসারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন দল—নীল, হলুদ ও সবুজ—একটি সমন্বিত দল গঠন করেছে, যার লক্ষ্য ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং কর্মকর্তাদের পদোন্নতি সহ অন্যান্য কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করা। এই সমন্বয়ক কাজটি নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরী তত্ত্বাবধানে চলছে।
কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ প্রেস কনফারেন্সে গভর্নরের ব্যাংক খাতের প্রতি “খেয়ালিপূর্ণ” মন্তব্য বন্ধ করার এবং ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়াকে বস্তুনিষ্ঠভাবে নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরেন। তিনি এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতো তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটি প্রধান ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে জোর দেন, তবে তা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোকে শক্তিশালী করবে, যা শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করবে।
পূর্ববর্তী সরকারের সময় ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নীরব ছিলেন—এ বিষয়ে মাসুম বিল্লাহ মন্তব্য করেন যে প্রশ্ন তোলার সময় এখনই, পূর্বে না তোলার জন্য কোনো দোষারোপ করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রশ্ন তোলা হলে তারা দায়িত্ব নিতে চাইবে না।
নওশাদ মোস্তফা উল্লেখ করেন যে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান না ঘটলে, কর্মকর্তারা এতটা মুক্তভাবে মত প্রকাশ করতে পারত না। তিনি অতীতের রাজনৈতিক অশান্তি এবং তার প্রভাবকে ব্যাংকিং নীতির স্বচ্ছতায় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সংবাদ সম্মেলন, সভা বা কোনো পাবলিক বক্তব্যের আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন না পেলে, অভ্যন্তরীণ ফোরামে আপত্তি উত্থাপন এবং সমাধানের সুযোগ রয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাজারে স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে, যা ব্যাংকিং সেক্টরের বিনিয়োগকারীর আস্থা ও শেয়ার মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না হলে, নীতি পরিবর্তন ও ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় বিলম্বের ঝুঁকি বাড়বে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, গভর্নরের মন্তব্য এবং কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া যদি সমন্বিতভাবে সমাধান না হয়, তবে ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই, উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা দ্রুততর করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা দেশের আর্থিক নীতি ও বাজারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



