মঙ্গলবার সকালবেলা, ঢাকা‑এর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো ভবনের ধ্বংসাবশেষে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ সপ্তম দিন চালু রয়েছে। এই প্রদর্শনীটি বিশিষ্ট শিল্পী মাহবুবুর রহমানের উদ্যোগে ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।
গত বছর ১৮ ডিসেম্বর রাতে, একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো ভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক লুটপাটের পর অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। গৃহীত অগ্নিকাণ্ডের ফলে ভবনের ভেতরে থাকা কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, আসবাবপত্র এবং বইপত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পুলিশ তদন্ত চালু করে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি জানায়।
প্রদর্শনী ‘আলো’ তে উপস্থাপিত শিল্পকর্মগুলো তথ্য, উপাত্ত ও অর্থনৈতিক ডেটা একত্র করে ঘটনার ঐতিহাসিক দিককে চিত্রায়িত করে। প্রতিদিন বিকেল ১১টা থেকে ১টা এবং ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং কোনো প্রবেশ ফি নেওয়া হয় না।
ক্যাননের পরিবেশক জেএএন অ্যাসোসিয়েটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ এইচ কাফি, যিনি এই আয়োজনের তত্ত্বাবধায়কও, ঘটনাস্থলকে “মানবিকতার প্রতি অবহেলা” এবং “জবরদস্তি সংস্কৃতির অংশ” বলে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন ধ্বংসাত্মক কাজ সমাজের জন্য সংকটজনক এবং পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
দুপুরে শিল্পী ঢালী আল মামুন প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন এবং মাহবুবুর রহমানের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই শিল্পকর্মগুলো তথ্য ও শিল্পের সমন্বয়ে একটি নতুন বর্ণনা গড়ে তুলেছে, যা দর্শকদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া জাগাবে।
চিত্রশিল্পী ওয়াকিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন এবং জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীরা পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, ভাঙা আসবাব এবং জ্বলে যাওয়া বইয়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন। বহুজনের চোখে অশ্রু দেখা যায়, যা ঘটনার গভীর প্রভাবকে প্রকাশ করে।
কারওয়ান বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সগর মীর, যিনি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার পথে ধ্বংসাবশেষের সামনে হেঁটে যান, বলেন, এই দৃশ্য তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি দাবি করেন, যারা ভবনটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, নতুবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর একই রকম আক্রমণ হতে পারে।
প্রদর্শনীটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে একত্রিত করার লক্ষ্য রাখে, যাতে তারা এই ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে দেশের প্রেসের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা কর্মীরা পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং শিল্পকর্মের সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ফোরেনসিক দল ভবনের অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ করে অপরাধীর সনাক্তকরণে কাজ করছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো গ্রেফতার হয়নি, তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সময়ে সময়ে তথ্য প্রদান করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর, মিডিয়া হাউসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রেসের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
‘আলো’ প্রদর্শনী চলাকালীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা প্রথম আলো ভবনটি এখন একটি স্মারক হিসেবে কাজ করছে, যেখানে শিল্পের মাধ্যমে ট্রমা থেকে উঠে আসার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। এই প্রচেষ্টা সমাজকে একত্রিত করে, ভবিষ্যতে এমন আক্রমণ রোধে সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করবে।



