ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় ইস্পাহান প্রদেশের দোরচেহ শহরে একটি সামরিক হেলিকপ্টার ধসে পাইলট, কো‑পাইলট এবং দুইজন ফল ব্যবসায়ীসহ মোট চারজনের প্রাণ নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটেছে মঙ্গলবার বিকালের সময়, যখন হেলিকপ্টারটি বাজারের কাছাকাছি উড়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, হেলিকপ্টারটি হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে আঘাত করে।
ধসে যাওয়ার পর গাড়ি ও গুদামপত্রে আগুন লাগায়, তবে দমকল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অগ্নি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। অগ্নি নিভে যাওয়ার পরেও আহতদের তীব্র চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যদিও এই মুহূর্তে কোনো অতিরিক্ত আহতের খবর পাওয়া যায়নি।
হেলিকপ্টারটি কোন মডেলের তা সরকারী সূত্রে প্রকাশ না করা হলেও, ইরানের সামরিক বাহিনীর বেশিরভাগ পুরনো বিমান ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগে কেনা হয়। এই পুরনো সরঞ্জামগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল যন্ত্রাংশ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে আনা কঠিন। ফলে, বিমানগুলোর নিরাপত্তা মান হ্রাস পায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা ইরানের বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে এই ধরনের ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তারা বলেন, স্যান্সার ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবের ফলে পুরনো বিমানগুলোকে নিরাপদে চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রের আকাশযানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় হামাদান প্রদেশে একই রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে একটি এফ‑ফোর যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ ফ্লাইটে থাকাকালীন বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটের মৃত্যু হয়। উভয় ঘটনার মধ্যে সময়ের পার্থক্য কম, যা ইরানের বিমান বাহিনীর সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইরানের এই ধারাবাহিক বিমান দুর্ঘটনাকে দেশের সামরিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন। তারা উল্লেখ করেন, যদি রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যাগুলো সমাধান না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান উভয়কেই প্রভাবিত করবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের বিমান রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার দিকে নজর দিয়ে বলছেন, স্যান্সার শিথিল করা বা বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল গড়ে তোলা জরুরি। কিছু দেশ ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম সম্পর্কিত আলোচনায় জড়িত, তবে নিষেধাজ্ঞার সীমা ও রাজনৈতিক বিবেচনা এখনও বাধা সৃষ্টি করছে।
একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “ইরানের পুরনো বিমানবহরের রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, ইরানকে আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করতে হবে, নতুবা বিমান দুর্ঘটনা তার সামরিক ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি জনসাধারণের আস্থা হারাতে পারে।
ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও এই ঘটনাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তুর্কি ও রাশিয়ান কূটনীতিকরা ইরানের বিমান রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইরানের বিমান দুর্ঘটনাকে অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য একটি সতর্কতা সংকেত হিসেবে দেখছেন।
ইরানের সরকার এই মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশ করেনি, তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় দ্রুত তদন্ত শুরু করার কথা জানিয়েছে। তদন্তে হেলিকপ্টারের রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড, পাইলটের প্রশিক্ষণ ও উড়ান পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদে, ইরানের বিমান বাহিনীর আধুনিকীকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন। নতুন প্রযুক্তি ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পুরনো বিমানবহরের ঝুঁকি কমিয়ে, দেশের সামরিক ও বেসামরিক উভয় আকাশযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই দুর্ঘটনা ইরানের বিমান রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার পুনরায় আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমর্থন ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে নিরাপদ উড়ান নিশ্চিত করতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল গড়ে তোলা অপরিহার্য হবে।



