২৪ থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ঢাকার তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি গ্যালারিতে একটি আর্কিটেকচারাল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এই ইভেন্টটি শুধুমাত্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রদর্শনী নয়, বরং আটটি স্বতন্ত্র ডিজাইন স্টুডিও তাদের সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশগুলোকে শিল্পকর্মের রূপে উপস্থাপন করেছে। দর্শকরা কেবল কাজগুলো দেখেনি, বরং প্রতিটি ইনস্টলেশনের সঙ্গে সময় কাটিয়ে, ঘুরে বেড়িয়ে, ধারণা ও নকশার পেছনের চিন্তাধারা অনুসন্ধান করেছে।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে দুটি বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুল ওয়ারের অধ্যাপক আধুনিক স্থাপত্যের ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন কীভাবে আধুনিকতা ভৌত সমাজের সেবা করতে গিয়ে অলঙ্কার ত্যাগ করে, ফলে আবেগগত সংযোগের ঘাটতি দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে পোস্টমডার্নের উত্থান ঘটে। তার বিশ্লেষণ অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে স্থাপত্যকে পুনরায় পড়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারহান করিম সহকারী অধ্যাপক তার বক্তৃতা দেন। তিনি ম্যানফ্রেডো টাফুরির তত্ত্বকে উল্লেখ করে আধুনিক স্থাপত্যের পুঁজি-সাম্যবাদী প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেন। টাফুরির মতে, আধুনিকতা পুঁজিবাদের বিরোধিতা না করে, বরং তার কার্যকরী হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রায়শই বাস্তবিকভাবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। করিমের উপস্থাপনায় কেনেথ ফ্র্যাম্পটনের কাজও উল্লেখ করা হয়, যা স্থাপত্যের তত্ত্বগত দিকের সঙ্গে বাস্তবিক প্রয়োগের সংযোগকে জোর দেয়।
প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত কাজগুলো সম্পূর্ণ ভবনের চিত্র নয়, বরং নকশা প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ—স্কেচ, মডেল, ডিজিটাল রেন্ডারিং—কে একত্রে দেখায়। এই পদ্ধতি দর্শকদেরকে নকশার সূক্ষ্ম বিবরণে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে, ফলে তারা স্থাপত্যের সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দিক উভয়ই অনুভব করতে পারে। ইনস্টলেশনগুলোতে আলো, ধ্বনি এবং ইন্টারেক্টিভ উপাদান ব্যবহার করে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে, যা দর্শকদেরকে কেবল দেখার নয়, অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
উদ্বোধনী দিনের পর থেকে দর্শকসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পেশাজীবী এই ইভেন্টে অংশ নিতে এসেছেন, যা আর্কিটেকচার শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে। বিশেষ করে, নকশা শিক্ষার্থীরা বাস্তব প্রকল্পের বদলে প্রক্রিয়ার অংশগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে তাদের সৃজনশীল চিন্তাধারা গড়ে তুলতে পারছে। এই ধরনের প্রদর্শনী ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ইভেন্টের সমাপ্তি পর্যন্ত আটটি স্টুডিও তাদের কাজের মাধ্যমে স্থাপত্যের সামাজিক দায়িত্ব, নান্দনিকতা এবং প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা একসাথে উপস্থাপন করেছে। দর্শকরা ইনস্টলেশনগুলোতে থেমে প্রশ্ন তুলেছেন, যেমন: “একটি ভবনের নকশা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে?” এবং “সামাজিক পরিবর্তনের জন্য স্থাপত্য কী ভূমিকা রাখতে পারে?” এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যৎ গবেষণা ও শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বিন্দু হিসেবে কাজ করবে।
প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরেও আলোকি গ্যালারিতে কিছু কাজের স্থায়ী প্রদর্শন রাখা হবে, যাতে নতুন দর্শকরা পরেও এই সৃজনশীল প্রক্রিয়ার অংশগুলো অন্বেষণ করতে পারে। এছাড়া, পরবর্তী মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর্মশালা এবং সেমিনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে নকশা প্রক্রিয়ার বাস্তবিক দিকগুলোকে আরও গভীরভাবে আলোচনা করা হবে।
এই ধরনের ইভেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তত্ত্ব ও ব্যবহারিক জ্ঞানকে একত্রে সংযুক্ত করতে পারবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে সহায়ক হবে। তুমি যদি স্থাপত্য বা ডিজাইন শিক্ষায় আগ্রহী হও, তবে এই ধরনের ইনস্টলেশন দেখার মাধ্যমে নকশার পেছনের চিন্তাধারা ও পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত, তুমি কি মনে করো, ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ধরনের প্রক্রিয়াভিত্তিক প্রদর্শনীকে পাঠ্যক্রমের অংশ করে নেবে?



