সাম্প্রতিক সময়ে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ক্লিনিকের শিক্ষার্থীরা গুলিস্তান স্টেডিয়াম গেট নং ৩ এলাকার রাস্তার শিশুদের সঙ্গে একটি সিরিজ সেশন সম্পন্ন করেছে, যেখানে ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সের ১৭ জন শিশুর কাজের ধরণ, দৈনিক আয় এবং শ্রম আইনের প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এই সেশনগুলো “স্ট্রিট ল” প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয় এবং সামাজিক সংগঠন পথের ইশকুলের সমর্থন পেয়েছে। আইন শিক্ষার্থীরা উন্মুক্ত কথোপকথনের মাধ্যমে শিশুরা কীভাবে জীবিকা অর্জন করে এবং তাদের কাজের পরিবেশ কেমন তা সরাসরি জানার সুযোগ পেয়েছে।
প্রধানত গুলিস্তান স্টেডিয়ামের গেট নং ৩ এর আশেপাশে বসবাসকারী শিশুরা এই আলোচনার অংশ হয়। এদের অধিকাংশই ছোট চা স্টল, শারবত শপ, ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ বা রাস্তা পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত। বয়সের পরিসর ৭ থেকে ১৭ বছর, এবং তাদের দৈনিক উপার্জন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, যা মৌলিক জীবিকা চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী কর্মীর বয়সের ভিত্তিতে তিনটি বিভাগ নির্ধারিত হয়েছে: চৌদ্দ বছরের নিচে শিশুরা সম্পূর্ণভাবে কর্মসংস্থান থেকে নিষিদ্ধ, চৌদ্দ থেকে অষ্টাদশ বছর বয়সের কিশোর-কিশোরী নির্দিষ্ট শর্তে কাজ করতে পারে, এবং অষ্টাদশ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রাপ্তবয়স্করা পূর্ণ কর্মসংস্থানের অধিকারী। তবে এই বিধানগুলো বাস্তবে চৌদ্দ বছরের নিচের শিশুরা যারা বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে, তাদের কোনো সুরক্ষা দেয় না।
আইনগত ফাঁকটি বিশেষত সেই শিশুরা যারা পারিবারিক সমর্থন বা সামাজিক সুরক্ষার অভাবে বাধ্য হয়ে কাজ করে, তাদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। যদিও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশুকে রক্ষা করার আহ্বান জানায়, তবু বাংলাদেশের বর্তমান আইন এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে।
আইন শিক্ষার্থীরা লক্ষ্য করেছে যে গুলিস্তান এলাকার বেশ কিছু শিশুর পরিবারিক পরিবেশে পর্যাপ্ত যত্ন বা আর্থিক সহায়তা নেই, ফলে তারা ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে নিজেরা উপার্জন করে। এই পরিস্থিতি শ্রম আইনের অনুমোদিত বয়সসীমার বাইরে থাকা শিশুরা কীভাবে জীবিকা চালায় তা স্পষ্ট করে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
সেশনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা নাহিদ নামের ১৫ বছর বয়সী এক শিশুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। নাহিদ দিনভর ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ এবং রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ করে, এবং তার দৈনিক আয় প্রায় ৩০০ টাকা। তার আয় মূলত ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে আসে এবং তিনি তা সঞ্চয় করে মৌলিক খাবার ও বাসস্থানের জন্য ব্যবহার করেন।
এই ধরনের ব্যক্তিগত গল্পগুলো দেখায় যে রাস্তার শিশুরা প্রায়শই শ্রম বাজারের অদৃশ্য অংশে পরিণত হয়, যেখানে তাদের কাজের শর্ত, নিরাপত্তা এবং বেতন সবই অনিয়ন্ত্রিত। আইনগত কাঠামোতে তাদের অন্তর্ভুক্ত না করা মানে তাদের শোষণ ও শারীরিক ঝুঁকির মুখে ফেলা।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে শ্রম আইনকে পুনর্বিবেচনা করে চৌদ্দ বছরের নিচের শিশুরা যারা বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে, তাদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, কাজের সময় এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এছাড়া স্থানীয় এনজিও এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে এই শিশুরা কোথায় কাজ করে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন তা নথিভুক্ত করা উচিত।
পাঠকরা যদি এই সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে চান, তবে নিকটস্থ সামাজিক সংগঠন বা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সরাসরি সাহায্য প্রদান, শিক্ষার সুযোগ তৈরি বা কাজের পরিবেশের উন্নয়নে অংশ নিতে পারেন। এই ধরনের উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে রাস্তার শিশুরা যেন আইনগত সুরক্ষার আওতায় আসে এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে, তা নিশ্চিত করবে।



