ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রে বেটেইল ভারতীয় জাতিগত ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, যা বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের গবেষণায় নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে। তার কাজের মূল বিষয় হল বর্ণ, শ্রেণি ও ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্ক, যা সমসাময়িক সামাজিক কাঠামো বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক।
প্রথমবার বেটেইলের ধারণার সঙ্গে পরিচয় ঘটে জুলাই ১৯৬৬-এ, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রারম্ভিক সমাজবিজ্ঞান ক্লাসে টম বটমোরের “Sociology: A Guide to Problems and Literature” (১৯৬২) পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করা হয়। ঐ পাঠ্যপুস্তকে বেটেইলের টাঞ্জোর গ্রাম গবেষণার উল্লেখ ছিল, যেখানে তিনি ভারতীয় জাতিগত ব্যবস্থার তত্ত্বকে বাস্তব উদাহরণে রূপান্তরিত করেছেন।
বটমোরের বইতে সামাজিক স্তরবিন্যাসের সাধারণ তত্ত্বকে ভারতীয় জাতিগত ব্যবস্থার ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং বেটেইলের গবেষণাকে সেই তত্ত্বের প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই সংযোগ শিক্ষার্থীদেরকে তাত্ত্বিক ধারণা ও বাস্তব ক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে সহায়তা করে।
দ্বিতীয়বার বেটেইলের কাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শীত ১৯৭৫-এ, যখন লেখক ডালহাউসি বিশ্ববিদ্যালয়, হ্যালিফ্যাক্সে মাস্টার্স থিসিস লিখছিলেন এবং টম বটমোরের তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে বেটেইলের “Closed and Open Social Stratification” (১৯৬৬) পাঠ করছিলেন। এই সময়ে বেটেইলের তুলনামূলক পদ্ধতি ও তাত্ত্বিক স্পষ্টতা লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, বিশেষ করে ভারতীয় সমাজের স্তরবিন্যাসের বিশ্লেষণে।
বেটেইলের গবেষণায় তিনি বর্ণের পাশাপাশি শ্রেণি ও ক্ষমতাকে স্বতন্ত্র ভেরিয়েবল হিসেবে বিবেচনা করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহ্যবাহী অপরিবর্তনীয় ব্যাখ্যা থেকে দূরে সরে, বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের দরজা খুলে দেয়।
১৯৭৬ সালের ক্রিসমাসে, টরন্টোর ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার সময়, লেখক কেআইশ্বরনের সঙ্গে ডিনার ভাগ করে বেটেইল ও তার পরামর্শদাতা এম.এন. শ্রীনিবাসের কাজ নিয়ে আলোচনা করেন। শ্রীনিবাসের “Tradition and Economy in Village India” (১৯৬৬) এর সঙ্গে বেটেইলের তত্ত্বের সমন্বয় সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ দৃষ্টিকোণ প্রদান করে।
বেটেইল ম্যাক্স ওয়েবারের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্তরবিন্যাসের বহুমাত্রিকতা নিয়ে গবেষণা করেন এবং সামাজিক অবস্থান কীভাবে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত তা বিশ্লেষণ করেন। তার পদ্ধতি বিভিন্ন সমাজের মধ্যে তুলনামূলক গবেষণার জন্য উপযোগী, বিশেষ করে গ্রামীণ ও নগর পরিবেশে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেটেইলের তত্ত্ব প্রয়োগ করলে দেখা যায় যে, গ্রামীণ এলাকায় জমির মালিকানা, ধর্মীয় পরিচয় ও আয় স্তর একসাথে সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি উত্তরাঞ্চলের গ্রামে ধান চাষের বড় জমিদার, উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষক ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা একে অপরের সঙ্গে জটিল ক্ষমতার নেটওয়ার্ক গঠন করে, যা শুধুমাত্র বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এমন বিশ্লেষণে বেটেইলের পদ্ধতি অনুসরণ করে গবেষকরা বর্ণ, শ্রেণি, ক্ষমতা ও অন্যান্য সামাজিক ভেরিয়েবলকে সমান্তরালভাবে বিবেচনা করতে পারেন। ফলে সামাজিক অসমতা ও পরিবর্তনের প্রকৃত কারণগুলো স্পষ্ট হয়, যা নীতি নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ হল, গবেষণার শুরুতে একটি বহুমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বর্ণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বতন্ত্র ভেরিয়েবল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ডেটা সংগ্রহের সময় এই সব দিকের তথ্য সংগ্রহ করলে বিশ্লেষণ আরও সমৃদ্ধ হবে।
তুমি যদি এখনই কোনো প্রকল্পে কাজ করো, তবে বেটেইলের তত্ত্বকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে দেখো—কোন কোন ভেরিয়েবল তোমার গবেষণায় বাদ পড়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তোমার বিশ্লেষণকে আরও গভীর করতে পারবে।



