জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ আটত্রিশ হাজার সাতশত একান্ন কোটি টাকা, তবে একই সময়ে মোট ঘাটতি ৬০ হাজার একশত তেরো কোটি টাকা হয়েছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তবে ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। ব্যবসা‑বাণিজ্যে মন্দা, বিনিয়োগের হ্রাস এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা সুদের হারের অপ্রত্যাশিত ওঠানামার সঙ্গে মিলে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে, আর আইন‑শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত না হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় সরকারী কোষাগারে টান বাড়ছে।
রাজস্ব ঘাটতির বিশদে দেখা যায়, আয়কর খাতে সবচেয়ে বড় ঘাটতি রেকর্ড হয়েছে, যেখানে লক্ষ্য ছিল এক লাখ ত্রিশ হাজার নয়শো আশি কোটি টাকা, কিন্তু বাস্তবে মাত্র সাত দশ হাজার পঞ্চান্ন কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ঘাটতি ২৮ হাজার নয়শো পঁচিশ কোটি টাকার বেশি।
আমদানি-শুল্ক থেকে প্রত্যাশিত আয়ও লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষ্য ছিল আটাত্তর হাজার চারশো ছিয়ানব্বই কোটি টাকা, তবে প্রকৃত সংগ্রহ মাত্র ছয় দুই হাজার আটশো চৌদ্দ কোটি টাকা, ফলে ১৫ হাজার ছয়শো তিরানব্বই কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ক্ষেত্রেও লক্ষ্য থেকে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। লক্ষ্য ছিল এক লাখ এক হাজার দুইশো পঁচাত্তর কোটি টাকা, কিন্তু সংগ্রহ হয়েছে আটানব্বই হাজার সাতশো ঊনসত্তর কোটি টাকা, ফলে ১৫ হাজার পাঁচশো ছয় কোটি টাকার ঘাটতি রয়ে গেছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার হ্রাস ভ্যাট আদায়ে প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আয়কর ও শুল্কের ঘাটতি মূলত ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের ধীরগতি, নতুন বিনিয়োগের অভাব এবং সরকারি প্রকল্পের স্থবিরতার ফলে হয়েছে। শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় শুল্কের আয় স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, দেশের ব্যবসা‑বাণিজ্যের টার্নওভার বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে। তবে বর্তমান সময়ে টার্নওভার বাড়তে না পারলে কর সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হবে।
রাজস্ব ঘাটতি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং নতুন সরকারকে আর্থিক নীতি ও কর সংগ্রহের কার্যকারিতা বাড়াতে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। ঘাটতি কমাতে করভিত্তি সম্প্রসারণ, শুল্ক নীতি পুনর্বিবেচনা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।



