জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২৩ ফেব্রুয়ারি জেনেভা থেকে মানবাধিকার কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য সতর্কতা জানিয়ে বলেন, বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের মুখে রয়েছে এবং শক্তির আধিপত্য দ্রুত বাড়ছে। তিনি এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
গুতেরেসের মতে, প্রভাবশালী দেশ ও গোষ্ঠী প্রায়শই সহিংসতা ও দমনকে চালিত করে, যা মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রবণতা একদিনের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে গড়ে ওঠা একটি প্যাটার্ন। ফলে আইনের শাসন পেশি শক্তির শাসনের দ্বারা অতিক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আইনের শাসনের দুর্বলতা ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার অভাবকে বাড়িয়ে তুলছে। গুতেরেসের কথায়, এই অবস্থা আন্তর্জাতিক নীতির সঠিক বাস্তবায়নকে বাধা দিচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের উল্লেখ না করলেও, গুতেরেস চার বছরের সংঘাতে ১৫,০০০ের বেশি বেসামরিক প্রাণহানি ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রক্তপাতের অবসান সময়ের আগে অতিক্রান্ত হয়েছে এবং তা মানবিক সংকটকে তীব্রতর করেছে। এই তথ্যকে তিনি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূখণ্ডের পরিস্থিতি নিয়ে গুতেরেস মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করেন। তিনি ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে থাকা এলাকায় দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথ ধীরে ধীরে বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে সতর্ক করেন। গুতেরেসের মতে, এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ধরণের অবহেলা সহ্য করা উচিত নয়, কারণ তা মানবিক কষ্টকে উপেক্ষা করে। তিনি উল্লেখ করেন, মানবাধিকার ক্ষয় শুধুমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। এই বিস্তৃত ক্ষয় বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার এখন ইচ্ছাকৃত, কৌশলগত এবং কখনো কখনো গর্বের সঙ্গে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ও শান্তিকে হুমকি দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক নীতির পুনর্বিবেচনা দাবি করে। গুতেরেসের মতে, সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই অবস্থা পরিবর্তন করা কঠিন।
গুতেরেসের বক্তব্যে মানবিক চাহিদার বৃদ্ধি, তহবিলের ঘাটতি এবং বৈষম্যের দ্রুত বিস্তার উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানান, অনেক দেশ ঋণ ও হতাশার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে, যা মানবিক সহায়তার কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এই আর্থিক সংকট মানবাধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদকে সীমাবদ্ধ করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ত্বরান্বিত প্রভাবও গুতেরেসের উদ্বেগের বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন, পরিবেশগত দুর্যোগের ফলে মানবিক সংকট বাড়ছে এবং দুর্বল জনগোষ্ঠী অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি মানবাধিকার রক্ষার জন্য অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা দাবি করে।
প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কীভাবে মানবাধিকার দমন, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই নতুন ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি করছে, তা গুতেরেস বিশ্লেষণ করেন। তিনি এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। গুতেরেসের মতে, সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রযুক্তি মানবাধিকারকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
গুতেরেসের শেষ মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, মানবাধিকার ভাঙলে সমাজের সব স্তরে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে এই প্রবণতা থামাতে হবে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তৎপর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের এই সতর্কতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত, যা মানবাধিকার রক্ষার জন্য নীতি, তহবিল এবং কার্যকরী পদক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। গুতেরেসের বক্তব্য ভবিষ্যতে মানবাধিকার সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে।



