গ্যাস লিকেজের ফলে চট্টগ্রাম হালিশহর ও ঢাকা দু’টি এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার ফলে মোট দশজন দগ্ধ হয়েছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের ঘটনায় ত্রয়ী তলা হালিমা মঞ্জিল ভবনের রান্নাঘরে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটায়, আর ঢাকায় একই রকম গ্যাস লিকেজের ফলে চারজন গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি।
চট্টগ্রামের ঘটনা গত রবিবার ভোরে হালিশহরের এসি মসজিদের পাশে অবস্থিত হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয় তলায় ঘটেছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়ে রান্নাঘরে সঞ্চিত গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার ফলে পুরো বাড়ি আগুনে জ্বলে ওঠে।
বিস্ফোরণে মোট নয়জন দগ্ধ হয়েছে। শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), উম্মে আইমন (৯), আয়েশা আক্তার (৪), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০) নামের ব্যক্তিরা আহত হয়েছেন। দগ্ধদের মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালির সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া নিশ্চিত করা হয়েছে। মো. শিপনের শ্বাসনালির ৮০ শতাংশ পুড়েছে, আর মো. সুমন ও মো. শাওনের শ্বাসনালির প্রায় অর্ধেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। তিনটি শিশুর শ্বাসনালির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মকবুল দগ্ধদের বাড়ি থেকে নিয়ে এসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পৌঁছে দেন। বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত জানান, দগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। তবে ঢাকায় রওনা হওয়ার পথে দগ্ধদের একজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, শ্বাসনালির পুড়ে যাওয়া ১০ শতাংশের বেশি হলে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক ধরা হয় এবং আইসিইউতে ভর্তি করা প্রয়োজন। শাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালির শতভাগ পুড়ে যাওয়ায় তাদের অবস্থা তীব্রভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শিশুরা, যদিও পুড়ে যাওয়া কম হলেও শ্বাসনালির ক্ষতি ২০-২৫ শতাংশে পৌঁছেছে, ফলে তাদেরও আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আগ্রাবাদ স্টেশনের দুইটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মোট চারটি ফায়ার ট্রাক প্রায় এক ঘন্টা ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস লিকের ফলে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পুরো বাড়িতে অগ্নি ছড়িয়ে পড়ে, ফলে দগ্ধদের সংখ্যা বাড়ে।
অধিকারের মতে, গ্যাস লিকের মূল কারণ চুলার সংযোগে ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাব হতে পারে। স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে লিকের সঠিক উৎস নির্ণয় করা হবে। গ্যাস লিকেজের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি ও প্রাণহানি রোধে ভবিষ্যতে গ্যাস সরঞ্জামের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় ঘটিত গ্যাস লিকেজের ফলে চারজন ব্যক্তি গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া রোগীরা শ্বাসনালির জ্বালার কারণে শ্বাসকষ্টে ভুগছে এবং তীব্র চিকিৎসা গ্রহণ করছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্যাস লিকের সুনির্দিষ্ট স্থান ও কারণ এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে তদন্ত চলমান।
দু’টি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্বাস্থ্য বিভাগ একত্রে গ্যাস নিরাপত্তা সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর তদারকি আরোপের পাশাপাশি গৃহস্থালী গ্যাস ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই দু’টি দুর্ঘটনা গ্যাস লিকেজের সম্ভাব্য বিপদকে আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে। কর্তৃপক্ষের মতে, গ্যাস সংযোগে ছোটখাটো ত্রুটিও বড় বিপদে রূপ নিতে পারে, তাই গ্যাস সরঞ্জামের নিয়মিত পরীক্ষা, সঠিক ব্যবহার ও লিকেজের প্রাথমিক সনাক্তকরণ জরুরি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে গ্যাস লিকেজ সনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে।
গ্যাস লিকেজের ফলে সৃষ্ট এই দু’টি ভয়াবহ ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের জন্য কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে গ্যাস ব্যবহারকারী সকলেই নিরাপদ পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে।



