গত তিন মাস ধরে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি মোকাবিলায় অনলাইন মৃত্যুনিবন্ধন সেবা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে নিবন্ধন প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোকে সরাসরি রেজিস্ট্রার অফিসে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও শ্রমের অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করছে।
সরকারি পোর্টাল bdris.gov.bd-তে এখন ব্যবহারকারী আইডি ও পাসওয়ার্ড চাওয়া হয়, যা শুধুমাত্র নিবন্ধক ও সহকারী নিবন্ধকের কাছে থাকে। সাধারণ নাগরিকের জন্য এই লগইন প্রক্রিয়া অপ্রাপ্য, ফলে অনলাইন আবেদন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
বৈধভাবে সেবা পুনরায় চালু করার জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলের প্রতিটি দপ্তরে ইমেইল পাঠানো হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই অপ্রতিক্রিয়াশীলতা সেবার পুনরুদ্ধারকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পেছনের কারণ স্পষ্ট: গত বছর ২১ নভেম্বর একটি ডেটা লিক ঘটায়, যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি হওয়ার খবর প্রকাশ পায়। এই ঘটনার পর নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনলাইন আবেদন গ্রহণ অবিলম্বে বন্ধ করা হয়।
মৃত ব্যক্তির পূর্বে জন্মনিবন্ধন না থাকলে, মৃত্যুনিবন্ধনের আগে প্রথমে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। এই অতিরিক্ত ধাপটি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমস্যার সৃষ্টি করে।
ডেটা লিকের পর কিছু ব্যক্তি এই তথ্য চুরি করে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করতে শুরু করে। এ ধরনের অপব্যবহার রোধে সিস্টেমে নতুন মৃত্যুনিবন্ধন আবেদন, মৃত্যুসনদ প্রিন্ট ও পুনর্মুদ্রণ ফিচারগুলো সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন আবেদন বন্ধ থাকলেও রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে আবেদন করা সম্ভব। তবে এই পদ্ধতি পূর্বের অনলাইন সুবিধার তুলনায় অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ।
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দেশের নাগরিক সেবার মৌলিক অংশ। জন্মনিবন্ধন ছাড়া শিশুর স্কুলে ভর্তি, সরকারি ভাতা, পিএসই ইত্যাদি সুবিধা পাওয়া যায় না। একইভাবে, মৃত্যুসনদ ছাড়া উত্তরাধিকার, সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন, পেনশন ও বীমা দাবি করা যায় না।
এক সময় উভয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা যেত; আবেদন জমা দেওয়ার পর কপি নিয়ে রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে সনদ হাতে নেওয়া যেত। এই পদ্ধতি নাগরিকদের জন্য সময় ও খরচের দিক থেকে সুবিধাজনক ছিল।
অনলাইন সেবা বন্ধ হওয়ায় এখন প্রত্যেক পরিবারকে রেজিস্ট্রার অফিসে শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় বাসিন্দাদের জন্য এটি বিশেষভাবে কঠিন, কারণ দূরত্ব ও পরিবহন খরচ বাড়ে।
প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বর্তমান পোর্টালের প্রমাণীকরণ ব্যবস্থা শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ কর্মীদের জন্য তৈরি, যা নাগরিকদের সরাসরি ব্যবহারকে বাধা দেয়। পাবলিক API বা স্বয়ংক্রিয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার অভাব নিরাপত্তা দুর্বলতাকে বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে একটি স্বতন্ত্র নাগরিক পোর্টাল তৈরি করা উচিত, যেখানে দুই-ধাপের প্রমাণীকরণ, এনক্রিপ্টেড ডেটা ট্রান্সমিশন এবং রিয়েল-টাইম অডিট লগ থাকবে। এ ধরনের ব্যবস্থা ডেটা লিকের ঝুঁকি কমিয়ে সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে।
অবধি, অনলাইন সেবা পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকদের জন্য একমাত্র বিকল্প হল রেজিস্ট্রার অফিসে সরাসরি আবেদন করা। সরকারকে দ্রুত প্রযুক্তিগত আপডেট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে সেবা পুনরুদ্ধার করা জরুরি, যাতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।



