ঢাকার মতিঝিলে ডিসিসিআই (ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) অফিসে গত সোমবার অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি তাসকিন আহমেদ ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদান বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন, আয়কর দপ্তরসহ সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নিয়মিত চাঁদা দিতে হচ্ছে, যা ব্যবসার ব্যয়কে অনাবশ্যকভাবে বাড়াচ্ছে।
এই অতিরিক্ত ব্যয় নতুন বিনিয়োগের আগ্রহকে কমিয়ে দিচ্ছে এবং বিদ্যমান উদ্যোগগুলোর লাভজনকতা হ্রাস করছে। তাসকিন আহমেদ বলেন, অনিয়মিত অর্থপ্রদান ব্যবসায়িক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।
তিনি তীব্রভাবে দাবি করেন, চাঁদাবাজি ও সরকারি দপ্তরের দুর্নীতি দমন না করা হলে বহু ব্যবসায়ী তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হবেন। তাসকিন আহমেদ নতুন সরকারের কাছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আহমেদ উল্লেখ করেন, পূর্বের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবসায়ীরা যে হারে চাঁদা দিতেন, তা ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের পরেও একই হারে বজায় রয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে তা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি যোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি হ্রাস পায়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তাসকিন আহমেদ জোর দিয়ে বলেন। তিনি এনবিআরকে পৃথকীকরণ এবং দ্রুত অটোমেশন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান, এবং উল্লেখ করেন যে সঠিক উদ্যোগ নিলে আট মাসের মধ্যে অটোমেশন শেষ করা সম্ভব।
ব্যাংক ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত কাগজপত্র ও জটিল পদ্ধতি ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্যতম বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাসকিন আহমেদ বলেন, এই ধরণের প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ করে ক্ষতিকর, কারণ তা ঋণ পাওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়।
বিনিয়োগ সহজতর করার জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি বলে তিনি জোর দেন। একক জানালার মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হলে বিদেশি ও দেশীয় উভয় বিনিয়োগকারীই সুবিধা পাবে।
আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তাসকিন আহমেদ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পূর্বের উচ্চ প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণে গ্রেস পিরিয়ডকে নয় মাস থেকে তিন মাসে কমানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা তাসকিন আহমেদ করেন। তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬,৪৪,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঋণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সঠিক শ্রেণিকরণ ছাড়া আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন। তাসকিন আহমেদ নতুন সরকারের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে নীতি সংশোধন ও বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানান।
সারসংক্ষেপে, তাসকিন আহমেদ ব্যবসায়িক চাঁদাবাজি, সরকারি দুর্নীতি, রাজস্ব ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং আর্থিক খাতের সংকটকে একসাথে মোকাবেলা করার জন্য সমন্বিত নীতি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি নতুন সরকারকে আইন-শৃঙ্খলা, রাজস্ব সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন।



