চট্টগ্রামের হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল ভবনের তৃতীয় তলায় ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার প্রায় ভোর ৫টায় গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘটনায় এক নারী নূরজাহান আক্তার রানি (৪০) সহ নয়জন দগ্ধ হন। দগ্ধদের মধ্যে রানি সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
বিস্ফোরণটি সেহরি প্রস্তুতির সময় হঠাৎ ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘরে আগুন ছড়িয়ে দেয় এবং পুরো বাড়ি জ্বলে ওঠে। দগ্ধ অবস্থায় ঘর থেকে বের হওয়ার পর প্রতিবেশীরা তৎক্ষণাৎ সাহায্য করে, আহতদের কাছাকাছি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালへ নিয়ে যায়।
প্রাথমিক চিকিৎসা সত্ত্বেও রোগীদের অবস্থার অবনতি দ্রুত ঘটায়। সন্ধ্যায় চিকিৎসকরা রোগীদেরকে ঢাকা শহরের জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকায় পৌঁছানোর পর নূরজাহান আক্তার রানি সম্পূর্ণ দগ্ধ অবস্থায় মৃত ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, রানি ছাড়া বাকি আটজনের দগ্ধতার মাত্রা ভিন্ন। সাখাওয়াত হোসেন ও পাখি আক্তারের দেহের ১০০ শতাংশ, শিপনের ৮০ শতাংশ, শাওনের ৫০ শতাংশ, আইমান ও আয়েশার প্রত্যেকের ৪৫ শতাংশ, সামিরের ৪৫ শতাংশ এবং সাত বছর বয়সী আনাসের ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
দগ্ধতার তীব্রতা অনুযায়ী রোগীদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছে। বাকি রোগীদেরও পর্যবেক্ষণের পর আইসিইউতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধতার পরিমাণ যত বেশি, তত দ্রুত শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বাড়িতে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাস লাইন ব্যবহার করা হতো। অনুমান করা হচ্ছে, চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়ে রাতভর ঘরে জমে ছিল এবং সেহরি প্রস্তুতির সময় কোনো শিখায় স্পর্শে এসে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
অগ্নি নির্বাপক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর প্রায় দুই ঘণ্টা কাজ করে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে। বিস্ফোরণের ফলে বাড়ির কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, দ্রুত পদক্ষেপের ফলে অতিরিক্ত প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
গ্যাস লিকের সম্ভাব্য কারণ ও নিরাপত্তা লঙ্ঘন নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত চলমান। গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার কাছ থেকে ঘটনাস্থলের গ্যাস লাইনের রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশও ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট গ্যাস লাইন ও বাড়ির নির্মাণ অনুমোদন যাচাই করছে। গ্যাস লিকের দায়িত্বে থাকা কোনো অবহেলা বা অনিয়ম প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই দুর্যোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে সরকারী ও বেসরকারি সংস্থা থেকে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা ব্যয় ও পুনর্বাসনের জন্য জরুরি তহবিল গঠন করা হয়েছে। রোগীদের শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হবে।
বিস্ফোরণের পর গ্যাস নিরাপত্তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে। গ্যাস লিকের লক্ষণ চেনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হচ্ছে।
এই ঘটনাটি গ্যাস নিরাপত্তা ও বাড়ির কাঠামোগত সুরক্ষার গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ত্বরিত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



