২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আক্রমণ শুরু করে, এবং চার বছর পরও সংঘর্ষের তীব্রতা কমেনি। রাশিয়া দ্রুত ১০ দিনের মধ্যে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধ এখন ১,৪৫০ দিন অতিক্রম করেছে। এই সময়ে রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনা ও বাস্তবতা মধ্যে বড় পার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে।
রাশিয়া যখন “বিশেষ সামরিক অভিযান” চালু করেছিল, তখন তার উচ্চপদস্থ পরিকল্পনাকারীরা এক সপ্তাহের মধ্যে বিজয় নিশ্চিত বলে আশাবাদী ছিলেন। তবে বাস্তবে শত্রু প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং ভূখণ্ডীয় জটিলতা তাদের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করেছে। ফলে রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতে আটকে পড়েছে, যা তার কৌশলগত লক্ষ্যকে ক্ষুণ্ন করেছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথমে ১০ দিনের মধ্যে ইউক্রেনের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করার প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। গবেষকরা উল্লেখ করেন, এই ভুল হিসাব রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করেছে।
আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক ক্ষয়ক্ষতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। চার বছরের মধ্যে প্রায় ৩,২৫,০০০ রাশিয়ান সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে মোট নিহতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। রাশিয়া এই সংখ্যাগুলি গোপন রাখলেও, বাহ্যিক বিশ্লেষকরা এই পরিসংখ্যানকে নিশ্চিত করে আসছেন।
ইউক্রেনের ক্ষতিও তীব্র, যদিও রাশিয়া তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, ইউক্রেনের মৃতদেহের সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখের মধ্যে হতে পারে। এই বিশাল মানবিক ক্ষতি কেবল যুদ্ধের তীব্রতা নয়, শরণার্থী সংকট ও অবকাঠামো ধ্বংসের পরিণতিও বাড়িয়ে তুলেছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি এখন এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, তা যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধের শেষের পরের সব সংঘাতে মোট মৃত্যুর চেয়ে বেশি।” তিনি যোগ করেন, এই পরিসংখ্যান রাশিয়ার সামরিক শক্তির পুনর্মূল্যায়নকে বাধ্য করবে এবং ভবিষ্যতে তার কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে।
যুদ্ধের দীর্ঘায়ু ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতি আন্তর্জাতিক ধারণা পরিবর্তন করেছে। পূর্বে কিছু বিশ্লেষক রাশিয়ার দ্রুত জয়কে সম্ভাব্য বলে দেখেছিলেন, কিন্তু এখন কিয়েভের মিত্র দেশগুলোও স্বীকার করেছে যে ইউক্রেনের সামরিক সংগঠন ও জনমত শক্তিশালী। একইসঙ্গে রাশিয়ার বিশাল সামরিক বাহিনীর মর্যাদা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বড় আঘাত পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই রক্তক্ষয়ের কথা বহুবার উল্লেখ করেছেন, এবং তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে রাশিয়ার আক্রমণ কেবল ইউক্রেনের নয়, পুরো ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে, এবং প্রতিটি মাসে মৃতসংখ্যা বাড়ছে, যা কোনো সময়ে কমবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
রাশিয়া যদিও নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশে অনিচ্ছুক, তবু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তথ্যের ভিত্তিতে স্পষ্ট যে, এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত রাশিয়ার সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে ক্ষয় করেছে। ভবিষ্যতে কোনো শান্তি চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত, এবং উভয় পক্ষের মানবিক ক্ষতি বাড়তেই থাকবে।



