ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত রবিবার মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর লক্ষ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক জোটের ধারণা উপস্থাপন করেন। তিনি প্রেস কনফারেন্সে ষড়ভুজ (hexagon) আকারের এই জোটের রূপরেখা তুলে ধরে বলেছিলেন, এটি ইসরাইলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে শক্তিশালী করবে।
প্রস্তাবিত জোটে ইসরাইলের পাশাপাশি ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। নেতানিয়াহু উল্লেখ করেন, এই দেশগুলোকে একত্রে এনে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা উগ্র সুন্নি ও শিয়া গোষ্ঠীর প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করতে সহায়তা করবে।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি বলছেন, অঞ্চলীয় চরমপন্থী শক্তিগুলোর মোকাবিলায় একটি ঐক্যবদ্ধ ব্লক গঠন করা, যা ইসরাইল ও পশ্চিমা স্বার্থের বিরোধী কার্যক্রমকে প্রতিহত করবে। তিনি দাবি করেন, এই জোটের মাধ্যমে ইসরাইলের কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবের পর থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো দেশই এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের ঘোষণা দেয়নি, এবং গ্রিস ও সাইপ্রাসের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য হওয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইতিমধ্যে গাজা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। এই আইনি বাধা জোটের সম্ভাব্য সদস্য দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন তারা একই আদালতে দায়বদ্ধ হতে পারে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এই পরিকল্পনাকে ‘ব্র্যান্ডিং এক্সারসাইজ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, তিনি উল্লেখ করেন যে এটি কোনো বাস্তবিক সামরিক জোটের চেয়ে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বড় করে দেখানোর একটি কৌশল হতে পারে। বিশ্লেষকরা জোটের কাঠামো ও কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন, কারণ এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইরান সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষের বিরুদ্ধে তার সামরিক সাফল্যকে তুলে ধরে এই নতুন জোটের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হিজবুল্লাহ, হুথি এবং ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কমাতে এই জোটের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন, এবং একই সঙ্গে সুন্নি প্রধান দেশগুলোর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন।
তবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সুন্নি দেশগুলো আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে ইসরাইলের আঞ্চলিক নীতি ও গাজায় চলমান মানবিক সংকটের প্রতি প্রতিবাদে একত্রিত হচ্ছে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশরের মতো দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কিছু বিরোধ থাকা সত্ত্বেও, ইসরাইলের সামরিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়িয়ে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে জোটের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্পষ্ট সমর্থন না পেয়ে, এবং আইনি বাধা ও রাজনৈতিক বিরোধের মুখে, জোটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। নেতানিয়াহু যদি জোটের সদস্য দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন গতিবিধি দেখা দিতে পারে।
অবশেষে, এই প্রস্তাবের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ইসরাইলের সরকার সম্ভবত সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে জোটের কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা জোটের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই জোটের সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, আইনি বাধা এবং অঞ্চলীয় শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের উপর।



