ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে আটজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করেছে। এই পদক্ষেপটি রাশিয়ার বিচার বিভাগে এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে, যারা রাজনৈতিক বিরোধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অভিযোগে শাস্তি আরোপে জড়িত বলে ইইউ দাবি করে। নিষেধাজ্ঞা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পেনাল কলোনি ও প্রাক-বিচার আটক কেন্দ্রের প্রধান, পাশাপাশি সেন্ট পিটার্সবার্গের একজন বিচারক। ইইউ এই সিদ্ধান্তটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছে, যাতে রাশিয়া সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি অমানবিক আচরণ বন্ধ করতে বাধ্য করা যায়।
ইইউয়ের প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হল রাশিয়ার বিচার ব্যবস্থার সেই অংশগুলোকে লক্ষ্য করা, যারা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করার জন্য আইনি কাঠামোকে ব্যবহার করে। বিশেষ করে, রাশিয়া সরকারের অধীনে কাজ করা কিছু বিচারক ও কারাগার প্রধানকে দায়ী করা হয়েছে, যারা বিশিষ্ট অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছে। এছাড়াও, রাজনৈতিক বন্দিদের অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর অবস্থায় আটকে রাখার জন্য দায়ী পেনাল কলোনি প্রধানদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত আটজন কর্মকর্তার মধ্যে চারজনের নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমে উল্লেখযোগ্য হল আলেক্সেই ভাসিলিভিচ ভালিজার, যিনি একটি পেনাল কলোনির প্রধান এবং তার শাসনকালে রাজনৈতিক বন্দিদের কঠোর শর্তে আটক রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত। দ্বিতীয় হল আন্তন ভ্লাদিমিরোভিচ রিচার, যিনি প্রাক-বিচার আটক কেন্দ্রের প্রধান এবং রাজনৈতিক অপরাধী সন্দেহভাজনদের দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখার জন্য দায়ী। তৃতীয় হল সেন্ট পিটার্সবার্গের বিচারক ইভা অ্যালেক্সান্দ্রোভনা গিউন্তার, যাকে ইইউ রাশিয়া সরকারের বিরোধী মতামত দমনকারী রায় দেওয়ার জন্য দায়ী করেছে। চতুর্থ হল আন্দ্রেই পাভলভিচ শিবাকভ, যিনি একই শহরের বিচারিক ব্যবস্থার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক মামলায় কঠোর রায় দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত।
আলেক্সেই ভাসিলিভিচ ভালিজার যে পেনাল কলোনি পরিচালনা করেন, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দ্বারা বহুবার অমানবিক শর্তের জন্য সমালোচিত হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক বন্দিদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত খাবার ও ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয় না। এই ধরনের শর্তাবলী রাশিয়া সরকারের বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নিঃশব্দ করতে সহায়তা করে বলে ইইউ এই কর্মকর্তাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আন্তন ভ্লাদিমিরোভিচ রিচার পরিচালিত প্রাক-বিচার আটক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক অপরাধী সন্দেহভাজনদের প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশনে দীর্ঘ সময় ধরে রাখা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। ইইউ উল্লেখ করেছে, রিচার এই কেন্দ্রের নীতি এবং পরিচালনা পদ্ধতি রাজনৈতিক দমনকে সহজতর করেছে, ফলে তিনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন।
সেন্ট পিটার্সবার্গের বিচারক ইভা অ্যালেক্সান্দ্রোভনা গিউন্তারকে ইইউ রাশিয়া সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্বশীল বলে চিহ্নিত করেছে। গিউন্তার যে রায়গুলো দিয়েছেন, সেগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে স্বতন্ত্র ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার অভাব দেখায় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
আন্দ্রেই পাভলভিচ শিবাকভের ক্ষেত্রে, তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের আদালতে রাজনৈতিক অপরাধী মামলায় কঠোর রায় দেওয়ার জন্য ইইউয়ের নজরে এসেছেন। শিবাকভের রায়গুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দ্বারা ‘অন্যায়’ ও ‘রাজনৈতিক দমন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা তাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
ইইউ এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তার বিদ্যমান রাশিয়া-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা কাঠামো ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ব্যক্তিগত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ এবং আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধতা অন্তর্ভুক্ত। নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত কর্মকর্তারা ইইউ সদস্য রাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না এবং তাদের আন্তর্জাতিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লকডাউন আরোপিত হবে। এই পদক্ষেপটি রাশিয়া সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
ইইউয়ের এই সিদ্ধান্তটি রাশিয়া সরকারের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার নতুন পর্যায় নির্দেশ করে, যেখানে রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়বদ্ধ করা হচ্ছে। রাশিয়া সরকারের পূর্ববর্তী রায়ে ইইউর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস রয়েছে, তবে এইবারের তালিকায় উচ্চপদস্থ বিচারিক ও কারাগার প্রধানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা রাশিয়া সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দমন নীতির সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া সরকারের রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং রাশিয়া সরকারের মানবাধিকার নীতির পুনর্বিবেচনা উত্সাহিত করতে পারে। তবে রাশিয়া সরকার কীভাবে এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনও অনিশ্চিত। ইইউয়ের এই পদক্ষেপ রাশিয়া সরকারের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়া সরকারের বিচারিক ও কারাগার ব্যবস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর ইইউর নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া-ইইউ সম্পর্কের নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, এবং রাশিয়া সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় অবস্থানকে পুনরায় নিশ্চিত করেছে। এই পদক্ষেপটি রাশিয়া সরকারের রাজনৈতিক দমন নীতির ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়িয়ে তুলবে এবং রাশিয়া সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপের একটি নতুন স্তর যোগ করবে।



