চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় ভোরবেলায় এক বাসায় বিস্ফোরণ ঘটায় অগ্নিকাণ্ডে নৌবাহিনীর মতো দগ্ধ হয়ে ৯ জন আহত হন, যার মধ্যে ৪০ বছর বয়সী রানী আক্তার আজ সন্ধ্যায় ঢাকা যাওয়ার পথে কুমিল্লা এলাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাস্থল, আহতদের অবস্থা এবং পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানানো হল।
সকাল ৪:৩০ টার দিকে হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল নামের ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি বাসায় অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের ফলে তৎক্ষণাৎ অগ্নি ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো ভবনের কাঠামো জ্বলে ওঠে। অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা দেখে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রায় দুই ঘণ্টা কাজের পরই অগ্নি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তবে আগুনের তীব্রতা এবং ধোঁয়ার প্রভাবের কারণে বাসার ভিতরে থাকা বেশ কয়েকজন বাসিন্দা গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়ে পড়েন। দগ্ধ অবস্থায় আক্রান্ত ৯ জনকে হালিশহর থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।
বার্ন ইউনিটে ভর্তি রোগীদের মধ্যে রানী আক্তার (৪০), শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), ডা. শিপন (৩০), ডা. সুমন (৪০), ডা. শাওন (১৭), ডা. আনাস (৭), উম্মে আইমন (৯), আয়েশা আক্তার (৪) এবং পাখি আক্তার (৩৫) অন্তর্ভুক্ত। বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী শাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার এবং রানী আক্তারের শ্বাসনালী সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গেছে। ডা. শিপনের শ্বাসনালির ৮০ শতাংশ, ডা. সুমন ও ডা. শাওনের শ্বাসনালির প্রায় অর্ধেক এবং তিনটি শিশুর (ডা. আনাস, উম্মে আইমন ও আয়েশা আক্তার) শ্বাসনালির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত জানান, ভোরে দগ্ধ অবস্থায় আনা রোগীদের অবস্থা “খুবই শঙ্কাজনক” এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোগীদের মধ্যে শ্বাসনালির গুরুতর ক্ষতি, ত্বকের বিস্তৃত দাগ এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা গিয়েছে, যা বিশেষায়িত শ্বাসযন্ত্র ও ত্বক চিকিৎসা ছাড়া নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।
রানী আক্তারের পরিবার থেকে মো. মকবুল হোসেন নিশ্চিত করেন, সন্ধ্যা ৭টার দিকে রানী আক্তারকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য অম্বুলেন্সে চড়িয়ে দেওয়া হয়। কুমিল্লা এলাকায় অম্বুলেন্সে গাড়ি চলার সময় রানী আক্তার মারা যান। পরিবারের সদস্যদের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া থানা এলাকায় অবস্থিত, এবং মৃতদেহটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাকি আহতদের মধ্যে কিছুকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে বিস্ফোরণের কারণ নির্ণয়ের জন্য ফোরেনসিক দলকে ডাকা হয়েছে এবং ভবনের গঠন, গ্যাস লাইন ও বৈদ্যুতিক সংযোগের সম্ভাব্য ত্রুটি যাচাই করা হবে। আইনগত দিক থেকে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক দায়ের সম্ভাবনা রয়েছে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পর, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রোগীর সংখ্যা বাড়ার ফলে অতিরিক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রক্তের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় দাতব্য সংস্থার সহায়তা চেয়েছে এবং রোগীদের জন্য বিশেষায়িত শ্বাসযন্ত্র সাপোর্ট ও ত্বক পুনর্গঠন সেবা প্রদান করছে।
বিস্ফোরণ ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভবনের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং পুনর্নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের দুর্ঘটনা পুনরায় না ঘটার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস লাইন, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং উচ্চতর ভবনের নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজনীয় বলে জোর দেওয়া হয়েছে।
রানী আক্তারের মৃত্যু এবং অন্যান্য দগ্ধ রোগীদের গুরুতর অবস্থা শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে শোকের ছায়া ফেলেছে। পরিবার ও বন্ধুদের সমবেদনা জানিয়ে, রোগীদের দ্রুত আরোগ্য ও পরিবারের জন্য শোক সমাপ্তির কামনা করা হচ্ছে।



