শেখ হাসিনার সরকার আগস্ট ২০২৪-এ পতনের পর, প্রশাসনিক ও বিচারিক শাখায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করেন, সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীও সরে দাঁড়ান। এমন বিশাল শূন্যস্থান সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার দায়িত্ব থেকে সরে যাননি, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কৌতূহল জাগায়।
মো. সাহাবুদ্দিনের মতে, তার কঠিন সময়ে বিএনপি সম্পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাকে অপসারণের প্রচেষ্টা ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনও পেয়েছিলেন, যা তাকে পদে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি উত্থাপিত হলে, বিএনপির সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে তার পদচ্যুতি বিরোধিতা করেন। তারা উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি সরিয়ে নিলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে, সংবিধানিক সংকটের ঝুঁকি বাড়বে এবং নির্বাচনের সময়সূচি বিঘ্নিত হতে পারে।
তবে, একই সময়ে দলটির উচ্চপদস্থ সদস্যরা এই বিষয় নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ডঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, তিনি এই আলোচনার বিশদে অবগত নন। অন্য একজন কমিটি সদস্যের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধের পরেও তিনি বলেন, দলটি রাষ্ট্রপতি বিষয়টি এমনভাবে পরিচালনা করেছে যাতে দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতায় কোনো ক্ষতি না হয়।
বিএনপি তখন সংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের নীতি অনুসরণ করেছিল। দলটি মনে করেছিল, শেখ হাসিনার পতনের পর যদি সংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণ করা হয়, তবে তা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলতে পারত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদও উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন চেয়েছে এবং কোনো প্রকারের রাজনৈতিক অস্থিরতা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়। তিনি বলেন, দলটি জানত যে দ্রুত নির্বাচন হলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হবে, তাই রাষ্ট্রপতি অপসারণের বিরোধিতা করা স্বাভাবিক।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, বিএনপি সরকারী কাঠামোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও দলটি পরে প্রকাশ্যে মন্তব্য বন্ধ করে দেয়, তবে তার অভ্যন্তরীণ নীতি স্পষ্ট ছিল: সংবিধানিক প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা রক্ষা এবং নির্বাচনের সময়সূচি নিশ্চিত করা।
এই পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে তা এখনো অনিশ্চিত। যদি দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে নতুন সরকার গঠন এবং নীতি নির্ধারণে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে, সংবিধানিক সংকটের সম্ভাবনা যদি পুনরায় উদ্ভূত হয়, তবে তা আবার রাজনৈতিক অশান্তি বাড়াতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে, তা সংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং নির্বাচনের ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ছিল। দলটির এই কৌশল ভবিষ্যতে রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করবে, বিশেষ করে যখন নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
বিএনপি এখনো স্পষ্টভাবে বলছে না যে তারা ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তবে বর্তমান অবস্থান থেকে দেখা যায়, তারা সংবিধানিক নীতি ও দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে দৃঢ়। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন গতিবিধি তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ভোটারদের মনোভাব এবং দলীয় কৌশলকে প্রভাবিত করবে।
অবশেষে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অবস্থান বজায় রাখতে বিএনপির ভূমিকা কীভাবে কাজ করেছে, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে রেকর্ড হবে। ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফলাফল এবং সংবিধানিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু চলা এই ঘটনায় নির্ভরশীল থাকবে।



