ঢাকায় উচ্চ আদালত আজ একটি আদেশ জারি করে, যেখানে সরকারকে সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্যহীন নীতি প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদেশটি আইবিএন সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি পিএলসি-র বিরুদ্ধে দায়ের করা এক রিটের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত চাকরির বিজ্ঞাপনটি এক্সিকিউটিভ/সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স) পদে আবেদনকারীকে শুধুমাত্র পুরুষ এবং practising Muslim হিসেবে সীমাবদ্ধ করে।
আদালত এই শর্তগুলোকে সংবিধানের সমতা, বৈষম্যবিরোধী এবং পেশা স্বাধীনতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রিটের আবেদনকারী আইনজীবী অনামিকা নাহরিনের পিটিশন অনুসারে, চাকরির প্রকৃতি ও দায়িত্বের সঙ্গে ধর্ম বা লিঙ্গের কোনো যুক্তি নেই, ফলে এই শর্তগুলো অযৌক্তিক এবং অবৈধ।
হাইকোর্টের দুই বিচারক, আহমেদ সোহেল ও ফাতেমা আনোয়ার, সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নির্দেশ দেন, যাতে তারা দ্রুত একটি সমন্বিত গাইডলাইন তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে কোনো সংস্থা একই রকম বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ না করতে পারে। গাইডলাইন তৈরির পাশাপাশি, আদালত তিন মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দাখিলের আদেশও দিয়েছে।
প্রতিবাদী পক্ষকে এখন স্পষ্ট করতে হবে, কেন তারা বৈষম্যবিরোধী নিয়মাবলী প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে এবং কেন এই ব্যর্থতা সংবিধানিক গ্যারান্টির বিরোধী নয়। আদালত তাদেরকে ‘শো কজ’ নোটিশ জারি করেছে, যাতে তারা ব্যাখ্যা করে কেন সকল কর্মস্থলে সমতা ভিত্তিক নিয়োগ নীতি বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়।
প্রতিবাদী তালিকায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, আইন, ন্যায়বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিরেক্টরেটের ডিরেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন অন্তর্ভুক্ত।
আইবিএন সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি পিএলসি, দেশের অন্যতম বড় ফার্মা সংস্থা, এই বিজ্ঞাপনটি প্রকাশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও লিঙ্গভিত্তিক সীমাবদ্ধতা আরোপের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। সংস্থার প্রতিনিধিরা এখনও কোনো মন্তব্য করেনি, তবে আদালতের আদেশ অনুসারে তারা শীঘ্রই সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
আইনজীবী সারা হোসেনের মতে, সংবিধানের ধারা ২৭, ২৮, ৩১ ও ৪০-এ উল্লেখিত সমতা, বৈষম্যবিরোধী, আইনের সুরক্ষা এবং পেশা স্বাধীনতার গ্যারান্টি স্পষ্টভাবে এই ধরনের শর্তকে অবৈধ করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যে কোনো পেশাগত পদে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতা ছাড়া ধর্ম বা লিঙ্গের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা সংবিধানের মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
এই আদেশের ফলে দেশের কর্পোরেট সেক্টরে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল ও স্বাস্থ্যসেবা শিল্পে, যেখানে দক্ষ আইনগত পেশাজীবীর প্রয়োজন, সেখানে বৈষম্যবিরোধী নীতি গ্রহণের ফলে যোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, আইবিএন সিনার মতো বড় সংস্থার ওপর এই ধরনের আইনি চাপ শিল্পের নিয়োগ নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মশক্তির বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে, সংস্থাগুলোকে তাদের মানবসম্পদ নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ না হয়।
অধিকন্তু, উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এখন নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো শর্ত যদি ধর্ম, লিঙ্গ, বয়স বা অন্যান্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ হয়, তা সংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ফলে, নিয়োগের সময় সংস্থাগুলোকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
এই আদেশের পর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে গাইডলাইন প্রস্তুত করতে এবং রিপোর্ট জমা দিতে তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। সময়মতো রিপোর্ট না দিলে অতিরিক্ত আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, হাইকোর্টের এই রায় দেশের কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে বৈষম্যবিরোধী নিয়োগ নীতি কার্যকর হলে, দেশের মানবসম্পদ বাজারে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষ পরিবেশ গড়ে উঠবে।



