একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষ কত দূর পর্যন্ত জন্মস্থান থেকে সরে যায়, তা জিনগত উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। গবেষণাটি ফেব্রুয়ারি ৬ তারিখে বায়োরেক্সিভে প্রকাশিত হয় এবং এতে যুক্তরাজ্যের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাচীন মানবের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে হাজার বছরের পূর্বের মাইগ্রেশন প্রবণতা যাচাই করা হয়েছে।
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ আইওয়ায়ের নিউরোজেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ এবং তার দল, যারা যুক্তরাজ্যের বৃহৎ জেনেটিক ডেটাবেস থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। মোট ২৫ লক্ষের বেশি অংশগ্রহণকারীর ডিএনএ এবং তাদের জন্মস্থান থেকে বর্তমান বাসস্থানের দূরত্বের তথ্য তুলনা করা হয়েছে।
ডেটা বিশ্লেষণের ফলাফল দেখায় যে যারা দীর্ঘ দূরত্বে স্থানান্তরিত হয়েছে, তাদের জিনে এমন পরিবর্তন রয়েছে যা মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত, বিশেষ করে উত্তেজনামূলক নিউরন (excitatory neurons) নামে পরিচিত কোষে সক্রিয় থাকে। এই কোষগুলো শিখন, পরিকল্পনা এবং অনিশ্চিত ফলাফলের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গবেষকরা উল্লেখ করেন যে এই জিনগত পার্থক্যগুলো মোট মাইগ্রেশন আচরণের প্রায় পাঁচ শতাংশই ব্যাখ্যা করে। অর্থাৎ, মানুষ কত দূর পর্যন্ত সরে যায়, তার মূল কারণের একটি ছোট অংশই জিনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তবে শিক্ষাগত স্তর, স্বাস্থ্য অবস্থা ইত্যাদি সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের পরেও এই জিনগত প্রভাব দৃশ্যমান থাকে।
এই ফলাফলগুলো নির্দেশ করে যে কর্মসংস্থান, বাসস্থান বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও মানব মস্তিষ্কের কাঠামো ও ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা মাইগ্রেশনকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ, স্থানান্তরের ইচ্ছা সম্পূর্ণভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক বা আর্থিক প্রেরণার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং আমাদের জিনে লুকিয়ে থাকা কিছু উপাদানও ভূমিকা রাখে।
প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণেও একই ধরণের জিনগত চিহ্ন পাওয়া গেছে। গবেষকরা প্রায় ১,৩০০ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করেছেন, যাদের জীবনের সময়কাল প্রায় দশ হাজার বছর আগে পর্যন্ত বিস্তৃত। এই প্রাচীন নমুনাগুলোর জিনেও আধুনিক মানুষের মতোই মস্তিষ্কের বিকাশে জড়িত জিনের বৈচিত্র্য দেখা গেছে, যা দীর্ঘ দূরত্বের মাইগ্রেশন প্রবণতার প্রাচীন মূলকে ইঙ্গিত করে।
এই ধরনের ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে মানবজাতির স্থানান্তরের প্রবণতা কেবল আধুনিক সমাজের কাঠামো নয়, বরং বহু প্রজন্মের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার ফল। প্রাচীন সময়ে শিকার, সংগ্রহ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যাত্রা করা মানুষদের জিনে এমন বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে, যা আজকের সময়েও কিছু মানুষের মধ্যে সক্রিয় থাকতে পারে।
একজন আচরণগত জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞের মতে, আমাদের ডিএনএতে এমন উপাদান রয়েছে যা স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। যদিও এই উপাদানগুলো সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না, তবু এটি দেখায় যে মানব মনের মধ্যে স্থানান্তরের প্রতি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা জিনগতভাবে প্রোথিত হতে পারে।
আধুনিক যুগে চাকরি পরিবর্তন, শিক্ষার জন্য স্থানান্তর বা ব্যক্তিগত স্বপ্নের অনুসরণে মানুষ প্রায়ই নতুন শহর বা দেশ বেছে নেয়। এই গবেষণার ফলাফল দেখায় যে এমন প্রবণতা শুধুমাত্র সামাজিক চাহিদা নয়, বরং আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ও জিনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে উল্লেখযোগ্য যে জিনগত প্রভাব মোট মাইগ্রেশন আচরণের একটি ক্ষুদ্র অংশই গঠন করে। তাই স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে পরিবেশ, অর্থনৈতিক সুযোগ, পারিবারিক অবস্থা এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্যগুলো এখনও প্রধান ভূমিকা রাখে। জিনের প্রভাবকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে, বহুমুখী কারণগুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা উচিত।
পাঠক হিসেবে আমরা আমাদের নিজস্ব স্থানান্তরের কারণগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারি। আপনার জীবনে নতুন শহরে যাওয়ার ইচ্ছা কি সামাজিক সুযোগের জন্য, নাকি কোনো অজানা আকাঙ্ক্ষা আপনার মধ্যে জাগ্রত করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হতে পারে।



